প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
এক বাক্স চকলেটের মূল্যা
লাইফস্টাইল ডেস্ক ||
চার মাস পর ছুটি নিয়ে গ্রামে ফিরল আরিফ। শহরের একটি কারখানায় বারো ঘণ্টা ডিউটি করে সংসারের স্বপ্ন বুনতে বুনতে সে যেন আগের চেয়ে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে।বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই মা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।—"আলহামদুলিল্লাহ! আমার ছেলেটা এসেছে! কী রে, এত শুকিয়ে গেছিস কেন?"আরিফ হেসে বলল,—"কাজের চাপ, মা। সব ঠিক আছে।"ব্যাগ থেকে এক বাক্স মিষ্টি বের করে মায়ের হাতে দিল।—"তোমার জন্য এনেছি।"মা দাম জিজ্ঞেস করতেই আরিফ বলল,—"সাড়ে তিনশো টাকা।"মা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,—"এই টাকা দিয়ে নিজের জন্য ফল কিনে খেতে পারতিস। সারাক্ষণ শুধু টাকা জমাবি, নিজের শরীরের দিকেও একটু তাকাস।"মায়ের কথায় ভালোবাসার অভিমান ছিল, অভিযোগ ছিল না।সারাদিন আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করে রাত গভীর হলে আরিফ ঘরে ফিরে এল। স্ত্রী নীহার পাশে বসতেই ব্যাগ থেকে সুন্দর মোড়ানো একটি চকলেটের বাক্স বের করল।—"এটা শুধু তোমার জন্য।"নীহার অবাক হয়ে বলল,—"শুধু আমার?"—"হ্যাঁ। বিদেশি চকলেট।"—"কত দাম?"—"আটশো টাকা।"নীহার কিছুক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,—"একটা কথা বলব?"—"বলো।"—"তুমি যখন জন্মেছিলে, আমি ছিলাম না। তোমার প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুলে যাওয়া—কোনো কিছুতেই আমি ছিলাম না। তোমাকে মানুষ করেছেন তোমার মা-বাবা। আজ যে মানুষটাকে আমি এত ভালোবাসি, তাকে গড়ে তুলেছেন তারা।"আরিফ নীরবে শুনছিল।নীহার আবার বলল,—"আজ তোমার মা সাড়ে তিনশো টাকার মিষ্টি নিয়েও কষ্ট পেলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছে তুমি নিজের জন্য কিছুই খাওনি। আর তুমি সেই মায়ের কাছেই আটশো টাকার চকলেট লুকিয়ে শুধু আমার হাতে তুলে দিচ্ছ। এটা কি সত্যিই ঠিক হচ্ছে?"ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।আরিফের চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের ক্লান্ত মুখ, বাবার নীরব হাসি, আর ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি।সে ধীরে ধীরে চকলেটের বাক্সটি আবার ব্যাগে রেখে দিল।পরদিন সকালে সবাই একসঙ্গে নাস্তা করছিল।আরিফ বাক্সটি খুলে বলল,—"আজ এটা সবাই মিলে খাব।"ভাতিজারা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বাবা মৃদু হেসে বললেন,—"এত দামী জিনিস আনতে হলো কেন?"আরিফ বাবার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,—"আপনাদের জন্য যা-ই আনি, সেটাই তো কম হয়ে যায়।"মা ছোট্ট এক টুকরো চকলেট মুখে দিয়ে বললেন,—"জীবনে প্রথম এমন চকলেট খেলাম।"কথাটা শুনে আরিফের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।সে বুঝতে পারল, শহরের বড় বড় দোকানে পাওয়া সবচেয়ে দামী উপহারও সেই আনন্দের সমান নয়, যা মা-বাবার মুখে একটি হাসি ফোটাতে পারে।নীহার চুপচাপ স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ছিল তৃপ্তির হাসি।আরিফ মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করল—"হে আল্লাহ, আমাকে এমন সন্তান বানিয়ে রেখো, যে কখনো মা-বাবার হক ভুলে না যায়। আর ভবিষ্যতে যদি আমাকে সন্তান দাও, তবে তাদের হৃদয়েও আমাদের প্রতি এমনই ভালোবাসা দিও।"সেদিন আরিফ শিখেছিল—দামী উপহারের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায়, কিন্তু পরিবারের সবাইকে আনন্দে শামিল করার মূল্য কোনো মুদ্রায় পরিমাপ করা যায় না।নৈতিক শিক্ষা:স্ত্রী যদি স্বামীকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তবে তিনি শুধু একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী নন; তিনি একটি পরিবারকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বরকতের বন্ধনে আবদ্ধ করার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠেন।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা