প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
শিক্ষায় বৈষম্য: ছেলেদের নীরব বলিদান ও সমতার ফাঁকা বুলিা
নিউজ ডেস্ক ||
বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে—এই গৎবাঁধা এবং একচোখা বুলিটি বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট মহল তোতাপাখির মতো আউড়ে যাচ্ছে। কিন্তু খোদ রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই কৃত্রিম মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। যদি সত্যিই বাল্যবিয়েই প্রধান কারণ হতো, তবে কেবল ছাত্রীদের সংখ্যাই কমার কথা ছিল। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ঝরে পড়ার এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হার এখন আশঙ্কাজনক। আর এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক চরম নির্মম ও বৈষম্যমূলক আচরণ, যেখানে একটা কিশোর ছেলের শৈশব আর স্বপ্নকে অকালেই বলি দেওয়া হয় কেবল তার লিঙ্গপরিচয়ের কারণে।বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের মাধ্যমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশই এখন ছাত্রী, আর ছাত্র বা ছেলেদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশে। অর্থাৎ, ক্লাসরুমগুলোতে ছেলেদের আসন দিন দিন শূন্য হয়ে যাচ্ছে। ব্যানবেইসের ড্রপআউট বা ঝরে পড়ার ইনডেক্স দেখায়, মাধ্যমিকে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক মন্দার যে ধাক্কা এসেছে, তার বেশিভাগই মূল্য চুকাতে হয়েছে ঘরের ওই কিশোর ছেলেদেরকেই।ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টের তথ্য আরও ভয়াবহ। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের স্কুল বহির্ভূত থাকার হার মেয়েদের চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেশি। যেখানে কিশোরীদের বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত থাকছে, সেখানে প্রায় ১৫ শতাংশ কিশোর অকালেই স্কুল থেকে ছিটকে পড়ছে। এই বিপুল পরিমাণ ছেলে কিন্তু বাল্যবিয়ের কারণে স্কুল ছাড়ছে না।এই অসমতার পেছনে রাষ্ট্র ও এনজিওগুলোর একপাক্ষিক সুযোগ-সুবিধার নীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। গত কয়েক দশক ধরে মেয়েদের পড়াশোনা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র ঢেলে সাজিয়েছে নানামুখী প্রণোদনা। ছাত্রীদের জন্য ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, টিউশন ফি মওকুফসহ শত শত এনজিওর স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। সামাজিক সচেতনতার কারণে আজ একটি মেয়ের বিয়ের পরেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথ অনেকটাই মসৃণ। শ্বশুরবাড়ি কিংবা বাপের বাড়ি উভয় পক্ষই এখন অন্তত মেয়েটার শিক্ষা শেষ করার ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক।কিন্তু এই পুরো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের বিপরীতে একটি কিশোর ছেলের জন্য কী সুবিধা আছে? উত্তর হলো, প্রায় শূন্য। ছেলেদের জন্য কোনো ঢালাও উপবৃত্তি নেই, কোনো টিউশন ফি মওকুফের ঢাল নেই, কিংবা কোনো এনজিও এসে তাদের শিক্ষার খরচ জোগানোর দায়িত্ব নেয় না। রাষ্ট্র এবং সমাজ ধরেই নিয়েছে, ছেলে হয়ে জন্মেছ যখন, নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হবে। ফলে সুযোগের এই বিশাল ভারসাম্যহীনতা ছেলেদের পড়ালেখা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।এই প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক নিষ্ঠুরতা। একটা মেয়েকে রাষ্ট্র ও সমাজ তার সুরক্ষা দেবার জন্য নানা ধরণের আইন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচী বানিয়ে রাখছে, কিন্তু একটা ১৪ বা ১৫ বছরের কিশোর ছেলের যখন পড়াশোনা করার কথা, তখন তার ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সংসারের হাল ধরার এক অলিখিত এবং অমানবিক জোয়াল। বাবার বয়স বেড়ে যাওয়া, পরিবারের ঋণ কিংবা স্রেফ দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে ওই ছোট্ট ছেলেটিকে ক্লাসরুম ছেড়ে নামতে হয় গ্যারেজের কালো মবিলের স্তূপে, রিকশার হ্যান্ডেলে কিংবা ইটভাটার তপ্ত কয়লায়।তারা যখন পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, তখন তারা নিজেদের পিঠে বহন করে পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার নির্মম বোঝা। সমাজ তাদের এই অকাল বলিদানকে স্রেফ পুরুষের দায়িত্ব বলে অবলীলায় এড়িয়ে যায়, তাদের জন্য কোনো গভীর দীর্ঘশ্বাস বা সমবেদনা জমা থাকে না কোনো সুশীল সেমিনারে। তাদের ক্লান্তি, তাদের ভাঙা স্বপ্ন আর হারিয়ে যাওয়া শৈশব নিয়ে কেউ কোনো মানবাধিকারের গল্প ছাড়ে না।এখানেই তথাকথিত সিলেক্টিভ বা সুবিধাবাদী সমতার আসল চেহারাটা উন্মোচিত হয়। সমতা বা ইকুয়ালিটির স্লোগানগুলো যখন জেন্ডারভিত্তিক সুবিধার খাপে খাপে মেলে, তখন টকশো থেকে শুরু করে বড় বড় এনজিওর সেমিনারে কান পাতা দায় হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন ওই একই সমতার চশমা দিয়ে একটা ১৪ বছরের কিশোরের হারিয়ে যাওয়া শৈশব কিংবা অবর্ণনীয় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে দেখার সময় আসে, তখন চারদিকে এক অদ্ভুত, রহস্যময় নীরবতা নেমে আসে। নারীবাদ বা মানবাধিকারের প্রবক্তারা যখন প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েদের সমান অধিকার আর সুযোগের দাবি তোলেন, তখন এই সমাজেই পুরুষদের জন্য এককভাবে নির্ধারিত অমানবিক এবং বৈষম্যমূলক দায়িত্বগুলোর বিরুদ্ধে তাদের কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। অধিকারের বেলায় শতভাগ সমতা নিশ্চিত করার তাগিদ থাকলেও, ত্যাগের বেলায় এসে পুরো পাল্লাটা এক তরফাভাবে একটি মাত্র লিঙ্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সেটাই যেন এই সমাজ এবং সুশীলদের চোখে স্বাভাবিক নিয়ম।বাস্তবতা হলো, যদি সত্যিকারের সমতায় বিশ্বাস থাকত, তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি সুরক্ষামূলক নীতিতে ছেলেদের জন্যও সমান সুযোগ বা ব্যাকআপের দাবি উঠত। অথচ আজ যখন স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্ররা গণহারে ঝরে পড়ছে, যখন একটা কিশোর নিজের পড়ালেখা আর স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিয়ে রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে চাকা ঘোরাচ্ছে বা ভারী জিনিস টানছে, তখন সেটাকে স্রেফ পুরুষের চিরন্তন ভাগ্য বলে স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়। নারীবাদীদের সমতার এই বয়ানে একটা মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটা যদি মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়, তবে সমতার খাতিরে একই বয়সের একটা ছেলের পড়াশোনা ছেড়ে সস্তা শ্রমে বাধ্য হওয়াটাও সমান অপরাধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সুবিধাজনক এই ইকুয়ালিটির বাজারে ছেলেদের এই নীরব বলিদান কোনো এজেন্ডাই হয়ে উঠতে পারে না। যখন অধিকার আর সুযোগের ভাগাভাগি কেবল একপক্ষের ঝুলিতেই জমা হতে থাকে আর বঞ্চনা ও কঠোর কর্তব্যের বোঝাটা অপরপক্ষের ঘাড়ে অবলীলায় ঠেলে দেওয়া হয়, তখন মুখে বলা ইকুয়ালিটি বা সমতা শব্দটা স্রেফ একটা ফাঁকা বুলি আর হিপোক্রেসির নামান্তর ছাড়া আর কিছুই থাকে না।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা