প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
ইয়ামালের জাদুতে স্পেনের ফাইনাল, ফ্রান্সের স্বপ্নভঙ্গা
স্পোর্টস ডেস্ক, গণবার্তাঃ ||
ম্যাচের প্রথম কিক থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত মাঠ জুড়ে শুধুই লাল রাজত্ব! আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফুটবলশৈলীর এক মাস্টারক্লাস দেখিয়ে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারালো স্পেন। ২০১০ সালের পর এই প্রথম এবং নিজেদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। আগামী রোববার মহাকাব্যিক ফাইনালে তারা মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের।বিরতির পর ফ্রান্সকে সুযোগই দেয়নি লা রিখারা। মাঝমাঠে রদ্রি ছিলেন বরাবরের মতোই রাজকীয়, লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়ার এনার্জি ছিল দেখার মতো। আর আক্রমণে দানি ওলমো ও লামিন ইয়ামাল ছড়িয়েছেন নান্দনিকতা। ২২ মিনিটে লুকা দিনিয়ের ভুলে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনকে লিড এনে দেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। এরপর ৫৮ মিনিটে ওলমোর সাথে চোখধাঁধানো ওয়ান-টু খেলে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোরো।অন্যদিকে, ফরাসিদের জন্য রাতটি ছিল একটি দুঃস্বপ্ন। লুকা দিনিয়ে পুরো ম্যাচেই ভুগেছেন, চুয়ামেনিকে ক্লান্ত লেগেছে, মাইকেল ওলিসে ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ। আর অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে স্প্যানিশ ডিফেন্সের সামনে ছিলেন সম্পূর্ণ ধারহীন। ফ্রান্সের বিদায়ের পর ডাগআউটে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমকে যখন ফ্যাকাশে মুখে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, স্প্যানিশ ডাগআউটে দে লা ফুয়েন্তের চোখে-মুখে ছিল মর্যাদাপূর্ণ আনন্দের আভা।৫৮ মিনিট: গোল! ফ্রান্স ০-২ স্পেন – দারুণ এক দলীয় আক্রমণে ব্যবধান দ্বিগুণ করলো স্পেন! মাঝমাঠ থেকে দানি ওলমো বল নিয়ে এগিয়ে পাস দেন ডান প্রান্তে থাকা পেদ্রো পোরোকে। পোরো ওলমোর সঙ্গে চমৎকার এক ওয়ান-টু-ওয়ান খেলে ফরাসি ডিফেন্স ভেঙে বক্সে ঢুকে পড়েন। এরপর ঠাণ্ডা মাথায় নিখুঁত সাইড-ফুটে ফরাসি কিপার মাইক মেনিয়কে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান এই রাইট-ব্যাক। ২ গোলে পিছিয়ে পড়ে মহা বিপদে ফ্রান্স!হাফটাইম: ফ্রান্স ০-১ স্পেন – আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করেছে স্পেন। মিকেল ওইয়ারজাবালের ২২ মিনিটের পেনাল্টি গোলটিই এখন পর্যন্ত ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।ম্যাচের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফুটবল খেলা লা রিখারা প্রথম ৪৫ মিনিটে ফরাসি রক্ষণভাগকে ভালোই চাপে রাখে। ২০ মিনিটে ফ্রান্সের লেফট-ব্যাক লুকা দিনিয়ের একটি মারাত্মক ভুলের সুযোগ নেন লামিন ইয়ামাল। দিনিয়ে বক্সে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ইয়ামালকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট-কিক থেকে ফরাসি কিপার মাইক মেনিয়কে পরাস্ত করে নিখুঁত শটে স্পেনকে লিড এনে দেন ওইয়ারজাবাল। এই বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়লো ফ্রান্স।পিছিয়ে পড়ার পর ফ্রান্স দল কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়ে। এর ওপর বড় ধাক্কা আসে যখন চোটের কারণে রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ উইলিয়াম সালিবা মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। স্পেনের লিড দ্বিগুণ হতে পারত যদি বক্সে চমৎকার এক পাসিং মুভমেন্ট থেকে ফাবিয়ান রুইজ শট লক্ষ্যভ্রষ্ট না করতেন।২২ মিনিট: গোল! ফ্রান্স ০-১ স্পেন – সেমিফাইনালের মহারণে পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনকে লিড এনে দিলেন মিকেল ওইয়ারজাবাল! ম্যাচের ২০ মিনিটে ঘটে আসল ঘটনা। ফ্রান্সের লেফট-ব্যাক লুকা দিনিয়ে একটি ক্লিয়ারিং হেড করতে গিয়ে বল মিস করেন, যা তার মাথার ওপর দিয়ে স্কিম করে পেছনে চলে যায়। বল হুক করে ক্লিয়ার করতে যখন তিনি ঘুরে শট নেন, তখন তিনি খেয়ালই করেননি যে তার ঠিক পেছন থেকে লামিন ইয়ামাল বলের নাগাল পেতে ঢুকে পড়েছেন। ফলে দিনিয়ের বুট সরাসরি আঘাত করে ইয়ামালকে, আর রেফারি কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেনাল্টির বাঁশি বাজান। নিজের মারাত্মক ভুলে তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল দিনিয়েকে।ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে দাবি করেন যে বলটি ইয়ামালের হাতে লেগেছিল। তবে রিপ্লেতে দেখা যায় বলটি তার স্লিভে (হাতে নয়) লেগেছে। ফলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। পেনাল্টি থেকে ডান দিকের পোস্ট লক্ষ্য করে জোরালো ও নিখুঁত এক শট নেন ওইয়ারজাবাল। ফরাসি কিপার মাইক মেনিয় সঠিক দিকে ঝাঁপিয়েও বলের গতি ও উচ্চতার কারণে তা স্পর্শ করতে পারেননি।বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে টেক্সাসের আর্লিংটনে মুখোমুখি হয় ইউরোপের দুই পরাশক্তি। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচে জয়ী দল পৌঁছে যায় বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে। বিশ্বকাপে দীর্ঘ ইতিহাসে এটি দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। ২০০৬ বিশ্বকাপে সর্বশেষ দেখায় ফ্রান্স জেতে ৩-১ ব্যবধানে। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালসহ বেশ কিছু বড় ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে এগিয়ে রয়েছে স্পেন।ম্যাচের আগে ফ্রান্স দলে এসেছে কৌশলগত পরিবর্তন। মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ থেকে দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে দিদিয়ের দেশমের দল। চোট সারিয়ে মাঝমাঠে ফিরেছেন অরেলিয়ে চুয়ামেনি, জায়গা পেয়েছেন ব্র্যাডলি বারকোলাও। অন্যদিকে, বেলজিয়ামকে হারানো অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই মাঠে নামে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। দুই রাউন্ডে ম্যাচ জেতানো সুপার-সাব মিকেল মেরিনোকে আজকেও বেঞ্চেই থাকতে হয়েছে। এটি ফ্রান্সের অষ্টম সেমিফাইনাল, যেখানে স্পেনের মাত্র দ্বিতীয়বার শেষ চারে খেলার অভিজ্ঞতা।ফ্রান্স একাদশ: মাইক মেনিয়ঁ (গোলকিপার), জুলস কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা, দায়োত উপামেকানো, লুকাস দিনিয়ে, আদ্রিয়া রাবিও, অরিলিয়ে চুয়ামেনি, ব্র্যাডলি বারকোলা, মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলে, কিলিয়ান এমবাপ্পে।স্পেন একাদশ: উনাই সিমন (গোলকিপার), পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, এমেরিক লাপোর্ত, কুকুরেয়া, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো, লামিন ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা, মিকেল ওইয়ারজাবাল।ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে মাথা নোয়ালেন। ঘাসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অন্তত এক মিনিট। শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। সতীর্থ আরও কয়েকজন মাঠ ছাড়তে চাচ্ছিলেন না। সান্ত্বনা দেয়ার মতো কেউ নেই। পুরো টিমই বিধ্বস্ত। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের চিত্র এটাই। চারদিকে আলাপ ছিল- এই অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সকে কে থামাবে। কিন্তু স্পেন থামিয়েই দিলো। ফরাসি দৈনিক লেকিপ বলেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ফ্রান্স সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। স্পেনের কাছে হারাটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ২০২৪ ইউরোর পর ফরাসিদের বিপক্ষে আরও একবার নিজেদের আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি ঘটালো স্প্যানিশরা। ফরাসি বাস্তিল দিবসে এই পরাজয়ে সবকিছু ম্লান হয়ে গেল। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছা হলো না তাদের। ম্যাচের কিছু অংশে স্পেনের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের সামনে ফ্রান্সের কোনো প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় তৈরি হয়েছিল অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। পেনাল্টির আট মিনিট পর ফরাসি শিবিরে দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। পিঠের ব্যথার কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা। এরপর ফ্রান্স কেমন যেন খেলার গতি হারিয়ে ফেলে। স্পেনের গোটা টিমের বিল্ডআপ ছিল চমৎকার। কুকুরেয়ার নাম উল্লেখ করতেই হয়। পোরোর পাস দেয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াটাও ছিল দারুণ। যদিও ফ্রান্স কয়েকবার চেষ্টা করেছিল স্পেনের জালে বল পাঠাতে। কিন্তু সবই ছিল এলোমেলো, নিয়ন্ত্রণহীন। এমবাপ্পেকে যেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি, পুরো টিমটার অবস্থাও ছিল নাজুক। ম্যাচটি শেষ হয় গ্যালারিতে উপস্থিত স্প্যানিশ সমর্থকদের বিপুল আনন্দধ্বনি আর ওলে ওলে স্লোগানের মধ্য দিয়ে। ফরাসি শিবিরে তখন কান্না।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা