প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
ইসলামী ব্যাংক দখলের নেপথ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনা
||
দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত একটি অধ্যায় হলো ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মালিকানায় সংঘটিত পরিবর্তন। সে সময় ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের হাত থেকে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চট্টগ্রামভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের কাছে।প্রায় আট বছর বাদে সেই পটপরিবর্তন এবং এর পেছনের ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনের সুবাদে। হাইকোর্টে জমাকৃত ওই নথিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে।তদন্ত প্রতিবেদনে সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে যা বলা হয়েছেবিএফআইইউর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনের সময় মো. সাহাবুদ্দিন এস আলম গ্রুপের ব্যাংক দখলের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চারটি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা সংস্থার অনুসন্ধানেও তার সংশ্লিষ্টতার সত্যতা মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে লন্ডনভিত্তিক খ্যাতনামা ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান The Lioyd এই অডিট রিপোর্টগুলো যাচাই এবং অনুমোদন করেছে।এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সাহাবুদ্দিনের সম্পৃক্ততাবিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের বেশ কিছু ধারা লঙ্ঘন করে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিভিন্ন বেনামি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার কিনে এবং ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নিজেদের লোকজনকে সেখানে বসানোর মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।সে সময় জেএমসি বিল্ডার্সের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন ব্যাংকটির পর্ষদে পরিচালক পদে আসীন হন এবং পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তবে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন।অনুসন্ধানে যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছেগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া, তহবিল তছরুপ ও নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিএফআইইউ। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে আদালতে জমা দেওয়া ৪২ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়, জেএমসি বিল্ডার্স ব্যাংক থেকে বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ ও অর্থ বের করে, সেই অর্থ দিয়েই আবার ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা অর্জনের জন্য শেয়ার কিনেছিল। অর্থাৎ, ব্যাংকের নিজস্ব টাকা দিয়েই ব্যাংকটিকে কব্জা করার এই অপকৌশল চালানো হয়।এছাড়া পর্ষদ নিজেদের দখলে নেওয়ার পর এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন বা কোলাটারাল ছাড়াই এসব ঋণ পাস করানো হয়েছিল, যার ফলে ব্যাংকটির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং তীব্র তারল্য সংকট দানা বাঁধে।ইসলামী ব্যাংক কেন বারবার আলোচনায়দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৃহত্তম হলো ইসলামী ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের হাতে চলে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি থেকে নামে-বেনামে বেনজির অঙ্কের ঋণ বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নজরদারি ও পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, ওই ঋণের বিশাল একটি অংশই এখন খেলাপি। এতে ব্যাংকটির মূলধন কাঠামো, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং আমানতকারীদের আস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ নতুন করে গঠন করে। এর ধারাবাহিকতায় বিএফআইইউসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা এস আলম গ্রুপের অর্থ পাচার ও জালিয়াতির তদন্ত শুরু করে এবং ব্যাংকটির শেয়ার ক্রয়ের পেছনের ইতিহাসও নতুন করে খতিয়ে দেখতে শুরু করে।আইনি পদক্ষেপ ও চলমান বিচার প্রক্রিয়াইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষ ২০২৫ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় শেয়ার জালিয়াতি, অভিনব প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব তথ্য বা অভিযোগের বিবরণ রয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই এখনো আদালতের রায়ে প্রমাণিত নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কার কী ধরনের দায়দায়িত্ব বা অপরাধ রয়েছে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই। তাই বর্তমানে এই প্রতিবেদনের সব তথ্যকে কেবল অভিযোগ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা