মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এখন সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা এবং কাতারএনার্জির উৎপাদন বন্ধের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে বেড়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। উদ্বেগ ছড়িয়েছে শেয়ারবাজারেও।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীর কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার পর এই দাম বৃদ্ধি পায়। তবে প্রাথমিক উল্লম্ফনের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারে নেমে এলেও উদ্বেগ কাটেনি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক কাতারএনার্জি তাদের স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ড্রোন রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে অবস্থিত তাদের একটি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করলে তারা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানায়, রাজধানী দোহার দক্ষিণে মেসাইইদ এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংকেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে প্রতিবেশী সৌদি আরবে ড্রোন হামলার পর উপকূলীয় রাস তানুরায় অবস্থিত আরামকোর প্রধান তেল শোধনাগারও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেন কোনো জাহাজ চলাচল না করে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীর প্রবেশমুখে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, দুটি জাহাজে হামলা হয়েছে এবং একটি তৃতীয় জাহাজের খুব কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ প্রায় ১ শতাংশ কমে লেনদেন শুরু করে। নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও নিম্নমুখী ছিল। লন্ডনে এফটিএসই ১০০ সূচক ১ শতাংশ কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে বিঘ্নের কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ার বড় পতনের মুখে পড়ে।
ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে আরও বড় পতন দেখা গেছে। ফ্রান্সের সিএসি-৪০ সূচক ১.৮ শতাংশ এবং জার্মানির ড্যাক্স সূচক দুপুরের দিকে ২.১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
বার্কলেস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসি'র মতো ব্যাংকগুলোর শেয়ারদরও কমে যায়। জ্বালানির দাম দীর্ঘসময় বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে এবং এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা স্থগিত করতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত স্বর্ণের দাম ২ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৫,৩৮৮ ডলারে পৌঁছেছে।
এমএসটি মারকির জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কেভোনিক বিবিসিকে বলেন, বাজারে এখনো তেমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েনি। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই তেল পরিবহন ও উৎপাদন অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেনি—এ নিয়ে কিছুটা স্বচ্ছতা রয়েছে। তিনি যোগ করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল শুরু হওয়ার লক্ষণ দেখলেই তেলের দাম আবার কমতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব তত গভীর হবে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বিনিয়োগের গতিপথ পর্যন্ত পরিবর্তন করে দিতে পারে। আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি ও কাতারের উৎপাদন পুনরায় চালু হওয়ার ঘোষণার দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা বিশ্ব। আমরা এই বিষয়ে নিয়মিত খবর রাখছি।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন