২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে ধসে পড়েছিল সাভারের আটতলা ভবন রানা প্লাজা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৫ জন পোশাক শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী ও তরুণ। এ ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি মামলাগুলোর বিচার। অধিকাংশ মামলা আটকে আছে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। ২০১৫ সালে সিআইডি ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। বিচার শুরু হয় ২০১৬ সালে। এরপর একের পর এক আসামি হাইকোর্টে যাওয়ায় মামলাটির বিচার থমকে থাকে ২০২২ সাল পর্যন্ত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ১৩৬ জন এবং আহত প্রায় এক হাজার জন। এ ঘটনায় সাভার থানায় দায়ের করা মামলায় ২০১৫ সালের ২৪ মে সিআইডি সোহেল রানাসহ ৪১ জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করে। বর্তমানে ৩৮ জন আসামির মধ্যে সোহেল রানা কারাগারে, ১৩ জন পলাতক এবং বাকিরা জামিনে আছেন। হত্যা মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, যা মাত্র ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। দীর্ঘ সময় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও সাক্ষী সংকটের কারণে বিচার কার্যক্রম বারবার পিছিয়েছে।
একই ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলার মধ্যে কেবল দুদকের একটি মামলার রায় হয়েছে, যেখানে অভিযুক্ত সোহেল রানার তিন বছর এবং তার মায়ের ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়। অন্য মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন। বর্তমানে হত্যা মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে চলমান। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে চলতি বছরেই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে রায় দেওয়া সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসামিপক্ষ ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ভুক্তভোগীরা এখনো ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় আছেন।
হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৫৯৪ জন সাক্ষী থাকলেও এখন পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও মাঝে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে প্রায় ছয় বছর বিচার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। নির্ধারিত অনেক তারিখেই সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে শুনানি পেছাতে হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে আগামী ৩০ এপ্রিল। রাষ্ট্রপক্ষের আশা, চলতি বছরেই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা সম্ভব হতে পারে।
আদালত সূত্রে মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল রানা প্লাজা ভবনে ফাটল দেখা দেয়। পরদিন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চারটি গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। জেনারেটর চালু হওয়ার পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে। ঘটনার পরদিন সাভার থানায় দণ্ডবিধির ৩০২, ৩২১, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুব জানান, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা খুনের শাস্তি নির্ধারণ করে, ৩২১ ধারা ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা, ১১৪ ধারা প্ররোচণাকারীর উপস্থিতিতে তাকে মূল অপরাধী হিসেবে গণ্য করা এবং ৩৪ ধারা অনুযায়ী একাধিক ব্যক্তি অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধ করলে সবাই সমানভাবে দায়ী হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ২৪ মে সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর ৪১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। প্রধান আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ভবন মালিক মো. সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক, মা মর্জিনা বেগম এবং সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেফাত উল্লাহসহ অন্যরা। তবে সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় কল-কারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তরের চার কর্মকর্তা এবং রাজউকের এক পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিদেশি নাগরিক ডেভিড মেয়র রিকোসহ আটজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে ৪১ জন আসামির মধ্যে কেবল সোহেল রানা কারাগারে আছেন। তার বাবা-মা মারা গেছেন। ১৩ জন পলাতক এবং জামিনে আছেন ২৫ জন। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অষ্টম আদালতে বিচারাধীন, যেখানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুহাম্মদ মুনির হোসাইন।
সাক্ষীদের দ্রুত উপস্থিত করা গেলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সরকারপক্ষের আইনজীবী। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ফয়সাল মাহমুদ বলেন, বিগত সরকারের সময় মামলাটিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এটিকে চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এক বছরে প্রায় ১৪৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব সাক্ষীর মধ্যে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আগামী ধার্য তারিখের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক সমন জারি করা হয়েছে। এতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বুয়েটের প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের মধ্যেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে রায় ঘোষণার আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় ভবন মালিক সোহেল রানা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভবন মালিক সোহেল রানার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা বলেন, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ বা দোষ প্রমাণের মতো অভিযোগ উপস্থাপন করা যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কারাগারে আছেন।
ধসে বেঁচে যাওয়া শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনরা এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তারা পাননি যথাযথ ক্ষতিপূরণ। আহত শ্রমিক মাসুদা বেগম জানান, দুর্ঘটনার পর কিছু অনুদান পেলেও এখনো তিনি পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি। তিনি বলেন, সরকার আসে আর যায়, কিন্তু যারা ভুক্তভোগী তারা কখনো মামলার রায় বা ন্যায়বিচার পায় না। নিলুফা ইয়াসমিন নামে আরেক আহত শ্রমিক বলেন, দীর্ঘ বছর পার হলেও ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি তাদের।
এদিকে শুক্রবার সকালে রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে নিহতদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আহত শ্রমিক, নিহতদের স্বজন, শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ সময় আহত ও নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং শ্রমিক হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তারা। সকালে দিবসটি উপলক্ষ্যে রানা প্লাজার সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে শ্রমিক সংগঠনগুলো।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন