গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলটির সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের ছোট বোন শেখ রেহানার অনুসারীদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন বলে দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুতির পর দল গুছিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে শেখ রেহানার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয় থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন শেখ হাসিনা। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই পদক্ষেপকে আওয়ামী লীগের একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ আত্মমূল্যায়ন হিসেবে বর্ণনা করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বেশ কয়েকজন নেতা এখন চরম চাপের মুখে রয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতারা যখন কেউ নির্বাসনে, কেউ কারাগারে, তখন দল পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় অনেককে সামনের সারির রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই শেখ রেহানা ও তার দেবর (স্বামীর ভাই) শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্ধিককে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠার গুঞ্জন ছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা শাসনামলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এই নেটওয়ার্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতো।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, উপদেষ্টা পদ, বেসামরিক প্রশাসন, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত বলে দাবি দলীয় সূত্রের। যদিও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কখনোই এই অভিযোগ প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সূত্র অভিযোগ করে, সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বড় বড় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রেহানার এই বলয়কে কেন্দ্র করে সক্রিয় ও অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন পদে নিয়োগ এবং বদলির পেছনে বিপুল আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও দলের ভেতরে ব্যাপকভাবে চাউর ছিল।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা, জনগণের অসন্তোষ এবং দলের পতনের কারণ নিয়ে আলোচনা করছেন। ইউরোপে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, শেখ হাসিনা এখন এমন নেতাদের নিয়ে দল পুনর্গঠন করতে চান যারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত।
দলের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, দুর্নীতি, অনিয়ম বা রাজনৈতিক বিতর্কে অভিযুক্ত নেতাদের ওপর শেখ হাসিনা আর আস্থা রাখতে চাইছেন না। প্রসিডিয়াম সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক নসরুল হামিদ বিপুসহ বিতর্কিত বেশ কয়েকজনের নাম দলীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, যারা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, তারা শেখ হাসিনার আস্থা অর্জন করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম; সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত।
জানা যায়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচি সফল করতে সংগঠনকে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জে তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্রের মতে, দল পুনর্গঠন এবং আগামী দিনের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য এই চারটি মহানগরী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করছেন শেখ হাসিনা।

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন