বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা বারবার পড়লেও মনে হয় যেন আজও ঘটছে। শুধু সময় বদলায়, কিন্তু মানুষের মন ও আচরণের ধরন বদলায় না। চে গুয়েভারা আর মোহাম্মদ করীমের গল্প দুটি এমন দুটি শিক্ষা, যা প্রতিটি প্রজন্মকে ভাবায়—স্বাধীনতার জন্য কে লড়ে আর কে তার মূল্য দেয়? আর যাদের জন্য লড়াই করা হয়, তারাই বা কীভাবে সাড়া দেয়?
প্রথম গল্প: চে ও বিশ্বাসঘাতক রাখাল
শোনা যায়, চে গুয়েভারাকে যখন তার আস্তানা থেকে এক বিশ্বাসঘাতক রাখালের কারণে ধরা হয়, তখন এক সৈনিক বিস্ময়ে সেই রাখালকে প্রশ্ন করেছিল—"কীভাবে তুমি এমন একজন মানুষকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলে, যিনি সারা জীবন তোমার অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন?" রাখাল নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিয়েছিল—"তার যুদ্ধ আমার ভেড়াগুলোকে ভয় পাইয়ে দিত।"
রাখালের এই উত্তর ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠ থেকে শুরু করে সংসদের কক্ষ পর্যন্ত; আদিবাসী গ্রাম থেকে উন্নত দেশের শহর পর্যন্ত—সর্বত্রই যেন শোনা যায়। রাখালের কাছে চে-এর স্বাধীনতার ডাক ছিল বিরক্তিকর। তার ভেড়াগুলো অভ্যস্ত ছিল শৃঙ্খলে; স্বাধীনতার শব্দ তাদের ভয় দেখিয়েছিল। রাখাল ভেবেছিল, চে-এর বিপ্লব তার জীবিকা কেড়ে নেবে, অথচ তিনি জানতেন না, চে আসলে তার ভেড়াগুলোর জন্য স্বাধীনতা আনছিল, শুধু ভেড়া বিক্রির সুযোগ নয়।
এই রাখাল আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমরা যখন কোনো মহান নেতাকে অবজ্ঞা করি, যখন তার আদর্শকে 'আদর্শবাদী' বা 'অবাস্তব' বলে উড়িয়ে দিই, তখনই আমরা সেই রাখাল হয়ে যাই।
দ্বিতীয় গল্প: মোহাম্মদ করীম, নেপোলিয়ন ও আলেকজান্দ্রিয়ার ব্যবসায়ীরা
এর বহু বছর আগে মিশরে মহান সেনানায়ক মোহাম্মদ করীম নেপোলিয়নের ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দি হলেন এবং আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিল। কিন্তু নেপোলিয়ন তাঁকে ডেকে বলল—"আমি এমন একজন বীরকে হত্যা করতে চাই না, যিনি সাহসের সঙ্গে নিজের মাতৃভূমি রক্ষা করেছেন। ইতিহাস যেন আমাকে বীর-ঘাতক হিসেবে না চেনে। তাই আমি তোমাকে ক্ষমা করব, যদি তুমি আমার সেনাদের ক্ষতির জন্য দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ক্ষতিপূরণ দিতে পারো।"
করীম হেসে উত্তর দিলেন—"আমার কাছে এত অর্থ নেই। তবে ব্যবসায়ীরা আমাকে এক লক্ষেরও বেশি স্বর্ণমুদ্রা ধার দিয়েছে।"
নেপোলিয়ন তাঁকে কিছু সময় দিল। করীমকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় সৈন্যদের পাহারায় বাজারে আনা হলো, আশায় যে যাদের জন্য তিনি জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তারা এগিয়ে আসবে। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী সাহায্যের হাত বাড়াল না। বরং তারা অভিযোগ করল যে আলেকজান্দ্রিয়ার ধ্বংস ও তাদের দুর্দশার জন্য করীমই দায়ী।
মনোবল ভেঙে যাওয়া করীম নেপোলিয়নের কাছে ফিরে গেলেন। তখন নেপোলিয়ন বলল—"আমি তোমাকে হত্যা করব না এজন্য যে তুমি আমাদের বিরুদ্ধে লড়েছ, বরং এজন্য যে তুমি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছ এক কাপুরুষ জাতির জন্য, যারা স্বাধীনতার চেয়ে ব্যবসাকে বেশি ভালোবাসে।"
এই গল্পগুলো আজও প্রাসঙ্গিক
মোহাম্মদ রশীদ রিদা এ ঘটনার সারমর্ম এভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন—"যে মানুষ অজ্ঞ জনগণের জন্য দাঁড়ায়, সে যেন অন্ধদের পথ দেখাতে নিজের শরীরকে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।"
প্রতিটি দেশেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের জটিলতা দেখা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কে কতটা পাশে ছিল আর কে পালিয়েছিল—সেই ইতিহাস বারবার আমাদের সামনে আসে। আজকের দিনেও প্রতিটি গণআন্দোলনে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে, কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সত্যিকার অর্থে আদর্শের জন্য আন্দোলন করে, আর কতজন কেবল প্রবাহের সঙ্গে ভেসে যায়?
শেষকথা
আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে স্বাধীনতার জন্য যারা লড়ে, তারা প্রায়শই একা হয়ে পড়ে। আর স্বাধীনতা পাওয়ার পর জনগণ সেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করলেও তাদের সংগ্রামী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করে না। রাখালের মতো আমরা আরামের ভেড়া পছন্দ করি, আর করীমের মতো নেতাদের আমরা দোষ দিই যখন আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ আঘাত পায়।
ইতিহাস প্রমাণ করে—যখন কোনো জাতি তার বীরদের সম্মান করা ভুলে যায়, তারা কেবল তাদের বীরদেরই হারায় না, বরং নিজেদের আত্মমর্যাদাও হারায়। আর সেই জাতি পরিণত হয় 'হতভাগ্য অকৃতজ্ঞ জাতি'তে—যেমনটি আমরা নিজেরাও মাঝে মাঝে অনুভব করি।
সত্যিকার স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন জনগণ বুঝতে পারে—স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব আছে। কেবল নেতারা নয়, প্রতিটি মানুষই স্বাধীনতার রক্ষক। আর সেই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে গেলে, আমরা কেবল করীমের মতো নেতাদেরই হারাই না, বরং নিজের ভবিষ্যতও হারাই।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন