দেশের অর্থনীতিকে সুদের জাঁতাকল থেকে মুক্ত করতে সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছেন রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি বিগত সরকারের আমলে দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ আখ্যা দিয়ে এর বিচার দাবি করেছেন। রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতে তিনি জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করেন এবং বিগত ১৭ বছরের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের শাসনামলে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। জামায়াত নেতা বলেন, আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ আমাদের শীর্ষ নেতাদের, যাদের অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ ১১ জন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি দাবি জানাই, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। প্রস্তাবিত নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, এই বিশাল বাজেটের ঘাটতি দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে তা উচ্চাভিলাষী। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সুদকে ‘বড় পাপ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে এক লাখ ২৭ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা। ৯২ ভাগ মুসলিমের দেশে সুদের এই বোঝা মেনে নেওয়া যায় না। সুদমুক্ত অর্থনীতি চালু করতে সরকার সুকুক (ইসলামী বন্ড) ইস্যুর মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। ২০২০ সাল থেকে চালু হওয়া সুকুক বন্ডকে আরও জনপ্রিয় করলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সুদমুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এমপি আজহার বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক ও পিকে হালদারের লুটপাটে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এর ওপর আবার ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা সৎ করদাতাদের জন্য অপমানজনক এবং সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। আমরা এই সুযোগ বাতিলের দাবি জানাই।
অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে সাত বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। পাচার অর্থ দেশে বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেত। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ) এর সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমার এলাকা অত্যন্ত অবহেলিত। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং কৃষকরা পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, নৈতিক মূল্যবোধ ও সততার বীজ বপনে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ওপরও জোর দেন তিনি।
এটিএম আজহারুল ইসলাম তার বক্তব্যে আরও বলেন, সুদমুক্ত অর্থনীতি বাস্তবায়নে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বিকল্প পথ খোলা জরুরি। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির পথে সুদই প্রধান বাধা। সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী হয়, তাহলে সুদমুক্ত অর্থনীতি চালু করতে হবে। তিনি সংসদে উপস্থিত সকল সদস্যের কাছে এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন চান। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। এটিএম আজহারুল ইসলামের এই বক্তব্য সংসদে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আগামী দিনে বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার বিষয়।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন