ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো দেশ। ভয়াবহ ওই হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিক, ৩ বাংলাদেশি এবং ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এ পাঁচ হামলাকারী নিহতের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয় ১৩ জিম্মিকে। দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্তিতে আজ স্মরণ করা হচ্ছে সেই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় সন্ধ্যার আমেজ ছিল অন্য সব ছুটির দিনের মতোই। তবে সেই শান্ত সন্ধ্যা মুহূর্তেই রূপ নেয় বিভীষিকায়। রাত প্রায় পৌনে ৯টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঢুকে পড়ে সশস্ত্র পাঁচ জঙ্গি। এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে তারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। তারা জিম্মিদের উদ্ধারের চেষ্টা চালালে, জঙ্গিরা গুলি ছোড়ার পাশাপাশি গ্রেনেড ও হাতবোমা নিক্ষেপ করে। এতে গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) সালাহউদ্দিন খান গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনেরই মৃত্যু হয়। আহত হন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। রাতের মধ্যেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোলি আর্টিজানের ভেতর থেকে গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যেতে থাকে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল মোতায়েন করা হয়। রাতেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম আমাক নিউজে এই হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়, আইএস। তবে শুরু থেকেই দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য-জেএমবি এই হামলা চালিয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ সরকার। ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে জিম্মি উদ্ধারে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। প্রায় ১৩ মিনিটের ওই অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জিম্মিকে। অভিযান শেষে প্রকাশ পায় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের চিত্র। জঙ্গিরা রাতেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে ২০ জন জিম্মিকে হত্যা করে। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক- ৯ জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি এবং একজন ভারতীয়। নিহত তিন বাংলাদেশি হলেন ফারাজ আইয়াজ হোসেন, ইশরাত আখন্দ ও অবিন্তা কবীর। দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ হামলায় মোট ২২ জন প্রাণ হারান।
হোলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার ঘটনায় ২০১৬ সালের ২ জুলাই গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। প্রায় দুই বছরের তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই সিটিটিসির পরিদর্শক হুমায়ুন কবির আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ ও অন্যান্য সহায়তায় জড়িত থাকার দায়ে নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারিক আদালতের রায় সংশোধন করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাঁদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া সাতজন হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘সাত আসামি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও হামলার ষড়যন্ত্র ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন, যা সাক্ষ্য-প্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’ তবে হাইকোর্টের মতে, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়টি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বিবেচনায় সংশোধনযোগ্য ছিল। তাই সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাঁদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলোর অন্যতম হিসেবে এখনও দাগ কেটে আছে হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি। এ ঘটনায় করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। দণ্ডিত সাত আসামির সবাই কারাগারে আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করছে। ঢাকার বুক থেকে হারিয়ে গেছে হোলি আর্টিজান বেকারির অস্তিত্বও। তবু ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত রাত দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ মোকাবিলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে স্থায়ী এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। হামলার এক দশক পূর্তিতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এই দিনটি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তারা বলেছেন, এই ট্র্যাজেডি যেন কখনো ভুলে না যায় এবং এ ধরনের ঘটনা যেন আর কখনো না ঘটে, সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। সরকারও জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। তবে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন