ছিলেন দলের মহাসচিব। এখন মহামান্য। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। গতকাল সংসদ সদস্যদের ভোটে আগামী ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি। সাধারণ কর্মী থেকে দলের মহাসচিব। পৌরসভা চেয়ারম্যান থেকে সবচেয়ে বড় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে। বর্ণিল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দল থেকে পেয়েছেন সবচেয়ে সম্মানের আসন।
সংসদ অধিবেশন কক্ষে বেলা দুইটা থেকে তিন ঘণ্টার ভোটগ্রহণ শেষে বিকালে গণনার পর ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। পরে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতাসহ সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানান। নির্বাচনের পর রাতেই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আজ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে বেলা ২টার দিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীন ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। আমি ঘোষণা করছি যে, সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পাওয়ায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি যথাযথভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাঁড়িয়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রথম করমর্দন করেন এবং তাকে লাল গোলাপ হাতে দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় পুরো সংসদ কক্ষের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি হাত তুলে সকল সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে সালাম জানান। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা ট্রেজারি বেঞ্চের কাছে এলে নতুন রাষ্ট্রপতি নিজের আসন থেকে বেরিয়ে বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে কোলাকুলি করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নিজের আসন থেকে এসে নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোলাকুলি করেন। পরে এমপিরা নিজ নিজ আসন থেকে এসে নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে করমর্দন করেন।
ভোট শুরুর আগে বক্তব্য দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীন। তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী, তাদের প্রস্তাবক ও সমর্থকের নাম ঘোষণা করেন এবং সংসদ সদস্যরা কীভাবে ভোট দেবেন তার নিয়ম বলে দেন।
প্রথম ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। প্রায় ৮ মিনিট সংসদ কক্ষে অবস্থানের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে ভোট দেন। প্রথমে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করেন। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে আবার পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করেন।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৬ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
ভোট শুরু থেকে একঘণ্টার অধিক সময় সংসদ কক্ষে নিজের আসনে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশের আসনে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এরপর অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী বিকাল ৩টা ১৩ মিনিটে সংসদ কক্ষ ছেড়ে নিজের কার্যালয়ে যান এবং দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নেন। পরে ৪টা ৪১ মিনিটে প্রার্থীকে নিয়ে সংসদ কক্ষে ফিরে আসেন সরকারপ্রধান।
৩৪৯ ভোটারের মধ্যে ৬ জন সংসদ সদস্য ভোট প্রদান থেকে বিরত ছিলেন। এদের মধ্যে অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে না আসার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা। অনুপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক। এ ছাড়া জামায়াতের সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য এমডি অলিউল্লাহ ভোট দেননি।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন ফখরুল। ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জিতে হন চেয়ারম্যান। ছাত্রজীবনের বাম রাজনীতি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপে। সেখান থেকেই বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন তিনি। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকারে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দুই মেয়ে নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রাহাত আরা বেগমের সংসার। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী-সন্তান নিয়ে আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ধানমণ্ডির সানি ডেল স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদকে গতকাল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে বিদায় জানিয়েছে বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর গত ২৪ জুলাই হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে শপথ পড়াবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন