ভারতের রাজনৈতিক চাপ ও ধর্মীয় বিতর্কের জেরে শেষ পর্যন্ত আইপিএল থেকে বাদ পড়লেন বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) তাঁকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।
গত মাসে অনুষ্ঠিত আইপিএল নিলামে ২ কোটি রুপি ভিত্তিমূল্যের মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ায় কলকাতা। এটি ছিল আইপিএলের ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ মূল্য। আগামী ২৬ মার্চ টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই কেকেআরের হয়ে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে সে যাত্রা থেমে গেল।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের কয়েকজন বিজেপি নেতা ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা গত কয়েক দিন ধরে আইপিএলে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে আসছিলেন। উত্তর প্রদেশের বিজেপি নেতা সংগীত সোম মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও আক্রমণ করেন। এমনকি বিমানবন্দর ঘেরাও ও ম্যাচ আয়োজন ব্যাহত করার হুমকিও দেওয়া হয়।
বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের পর সংগীত সোম বলেন, “এটি ১০০ কোটি সনাতনী হিন্দুর আবেগের জয়। বিসিসিআই মানুষের অনুভূতিকে সম্মান করেছে।”
একই সুরে কথা বলেন উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী নরেন্দ্র কাশ্যপ ও ধর্মীয় নেতা দেবকীনন্দন ঠাকুর। তাঁরা সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেন, দেশের আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একজন খেলোয়াড়কে, একটি দেশকে নাকি একটি ধর্মকে?” তাঁর মতে, খেলাধুলাকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতের বাইরে রাখা উচিত।
১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী ভারতের সাবেক অলরাউন্ডার মদন লালও মনে করেন, ওপর মহলের চাপেই বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, “খেলাধুলার মধ্যে রাজনীতির এমন অনুপ্রবেশ ভালো লক্ষণ নয়। এখানে মোস্তাফিজ পরিস্থিতির শিকার।”
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানিয়েছে, বিসিসিআইয়ের অনুরোধেই মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলার জন্য এনওসি দেওয়া হয়েছিল। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন বলেন, এখনো বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কিছু জানায়নি। তবে বোর্ডের একটি সূত্র বলছে, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমিত।
৩০ বছর বয়সী মোস্তাফিজ এর আগে আইপিএলের ৮টি আসরে ৫টি ভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। তাঁর কাটার ও অভিজ্ঞতা আইপিএলে বরাবরই কদর পেয়েছে। এবার রেকর্ড দামে কেনা হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই অধ্যায় শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি খেলোয়াড়ের বাদ পড়া নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন যে ক্রমেই ক্রীড়াঙ্গনে প্রভাব ফেলছে, তারই বড় উদাহরণ।

সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন