কারাকাস তখন গভীর ঘুমে। রাত পেরিয়ে ভোরের দিকে এগোচ্ছে সময়। হঠাৎই নিস্তব্ধতা চিরে আকাশ কাঁপানো বিস্ফোরণ। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রাজধানী শহরটি যেন হারিয়ে ফেলে তার চেনা রূপ। আলো নিভে যায়, রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়ে, আকাশে ভেসে বেড়াতে থাকে যুদ্ধবিমান আর হেলিকপ্টারের গর্জন। শুরু হয়ে যায় এমন এক সামরিক অভিযান, যার পরিণতিতে ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র।
৩ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে শুরু হওয়া এই অভিযানে লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট—দেশটির সামরিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে, এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। এতে ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এই অভিযানের কৌশল ছিল প্রচলিত যুদ্ধের বাইরে। কোনো দীর্ঘস্থায়ী দখল বা স্থলযুদ্ধ নয়—বরং সামরিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, অভিযানের মধ্য দিয়েই ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করে দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এটিকে একটি ‘নির্ভুল ও সীমিত সামরিক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অভিযান সাধারণত দীর্ঘ গোয়েন্দা প্রস্তুতির ফল। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে সেটিও ব্যতিক্রম নয়। কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা এবং সামরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে ‘নরম’ করা হয়েছিল—যার শেষ ধাপ হিসেবেই এই আকস্মিক আঘাত।
হামলার পরপরই রাজধানী কারাকাসে নেমে আসে এক ভৌতিক নীরবতা। সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পায়নি। রাস্তায় দেখা গেছে সাঁজোয়া যান, আকাশে টহল দিয়েছে যুদ্ধবিমান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি সরকার।
ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস এক অডিও বার্তায় জানান, সরকার এখনো জানে না প্রেসিডেন্ট কোথায় আছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাদুরো ও ফার্স্ট লেডির জীবিত থাকার প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলায় সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য ও সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
এই সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রশ্ন তুলেছে। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি করা হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এমন সামরিক অভিযানের সাংবিধানিক বৈধতা কতটা?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের সীমা—এই দুইয়ের সংঘাতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে ওয়াশিংটনে।
ভেনিজুয়েলায় এই অভিযান শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো লাতিন আমেরিকায়। একদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের নজির, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্থিরতার আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে।
কারাকাসের সেই অন্ধকার রাত তাই কেবল একটি শহরের আতঙ্কের গল্প নয়—এটি বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতা, আইন এবং সামরিক কৌশলের এক ভয়ংকর সংযোগের প্রতিচ্ছবি।

সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন