ঢাকা    সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
গণবার্তা

বাংলার আকাশে মার্কিন শকুন

বাংলার আকাশে মার্কিন শকুন
রাজশাহীর আকাশে ক্যামেরার ফ্রেমবন্দী দুর্লভ আমেরিকান কালো শকুন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আকাশে শকুন দেখা এখন বিরল ঘটনা। তার ওপর যদি সেটি হয় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা—তবে বিস্ময় আরও বাড়ে। ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী হলো রাজশাহীর আকাশ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ক্যামেরাবন্দী হয়েছে অত্যন্ত দুর্লভ আমেরিকান কালো শকুন (American Black Vulture)—যার উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা এশিয়ার আকাশেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এর শুরু অবশ্য আরেকটি বিরল পাখিকে ঘিরে। ছোট কালী পেঁচা (Jungle Owlet)—বাংলাদেশে যার উপস্থিতি প্রথম নিশ্চিত হয় ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আনিসুজ্জামান মো. সালে রেজা প্রথম পাখিটিকে শনাক্ত করেন। এর মাধ্যমে দেশের পাখি তালিকায় যুক্ত হয় নতুন একটি নাম। এরপর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে বন্য প্রাণী আলোকচিত্রীরা এই পাখির সন্ধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছুটে আসছেন।

২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর, ছোট কালী পেঁচার ছবি তুলতে রাজশাহীতে আসেন দুই তরুণ বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী—তানভীর তাসনিম অভিগাজী আল মাহমুদ মারুফ। অভির সংগ্রহে আগে থেকেই কালী পেঁচার ছবি থাকলেও মারুফ তা ক্যামেরাবন্দী করতে পারেননি। অভির সহযোগিতায় সেদিন মারুফের স্বপ্ন পূরণ হয়।

ছবি তোলার পর দুজন হাঁটতে হাঁটতে চলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের বদ্ধভূমি এলাকার দিকে। সেখানে তারা বামুনি শালিক, মৌটুসি, মাছরাঙা ও কুড়া ঈগলসহ বেশ কয়েকটি পাখির ছবি তোলেন। এ সময় আকাশে উড়তে থাকা কয়েকটি শিকারি পাখির দিকে নজর পড়ে অভির। টেলিলেন্স তাক করে ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখতেই ক্যামেরাবন্দী হয় দুটি মধুবাজ ও একটি বিশাল আকৃতির শকুন।

অভির বন্য প্রাণী আলোকচিত্র যাত্রা খুব বেশি দিনের না হলেও ইতোমধ্যে সে শতাধিক পাখির ছবি তুলেছে। ওই দিনটি তার জন্য ছিল বিশেষ—কারণ, উড়ন্ত শকুনের ছবিটি ছিল তার ১৫০তম পাখির আলোকচিত্র। শুরুতে ধারণা করা হয়, এটি হয়তো দুর্লভ বাংলা শকুন (White-rumped Vulture)। তবে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যায়—এর গায়ের রং ও ওড়ার ভঙ্গি দেশীয় শকুন বা হিমালয়ান গৃধিনীর সঙ্গে মেলে না।

পরবর্তীতে অভি ছবিটি পাখিবিষয়ক কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেন। সেখানে অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মতামত ছিল প্রায় একবাক্যে—এটি আমেরিকান কালো শকুন

এই শকুন সাধারণত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এদের বিচরণভূমি। পালকহীন ধূসর মাথা ও গলা, চকচকে কালো শরীর এবং প্রায় পাঁচ ফুট ডানার বিস্তার—সব মিলিয়ে পাখিটি সহজেই নজর কাড়ে। মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকা এ শকুনগুলো সামাজিক স্বভাবের এবং দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে।

রাজশাহীর আকাশে এমন একটি পাখির উপস্থিতি নিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মনিরুল হাসান খানের সঙ্গে। তিনি বলেন,

“এটা তো নর্থ আমেরিকার পাখি। স্বাভাবিকভাবে এদেশের আকাশে থাকার কথা নয়।”

তবে তিনি আরও যোগ করেন,

“এ ধরনের ঘটনা একেবারে অস্বাভাবিকও নয়। বিশ্বজুড়ে বন্য প্রাণী চোরাকারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। কখনো কখনো পাচারের সময় ধরা পড়া প্রাণী বা পাখিকে পরে কোনো অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়। সম্ভবত এই আমেরিকান কালো শকুনটিও ভারত বা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে উদ্ধার হয়ে পরে প্রকৃতিতে ছাড়া পেয়েছে।”

এই ব্যাখ্যার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। এমন অভিজ্ঞতার উদাহরণও আছে। ২০০২ সালের ৩ ডিসেম্বর নরসিংদীর চরসিন্দুর থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বালু বোরা (Common Sand Boa) সাপের জীবন্ত নমুনা উদ্ধার হয়—যা ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রাণী নয়। পরবর্তীতে জানা যায়, বেদে সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে সাপটি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল।

প্রকৃতি তাই মাঝেমধ্যেই এমন রহস্যময় ঘটনার জন্ম দেয়। তবে মনোযোগী পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণই আমাদের প্রকৃত সত্যের কাছে পৌঁছে দেয়।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬


বাংলার আকাশে মার্কিন শকুন

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image
বাংলাদেশের আকাশে শকুন দেখা এখন বিরল ঘটনা। তার ওপর যদি সেটি হয় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা—তবে বিস্ময় আরও বাড়ে। ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী হলো রাজশাহীর আকাশ।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ক্যামেরাবন্দী হয়েছে অত্যন্ত দুর্লভ আমেরিকান কালো শকুন (American Black Vulture)—যার উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা এশিয়ার আকাশেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।এর শুরু অবশ্য আরেকটি বিরল পাখিকে ঘিরে। ছোট কালী পেঁচা (Jungle Owlet)—বাংলাদেশে যার উপস্থিতি প্রথম নিশ্চিত হয় ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আনিসুজ্জামান মো. সালে রেজা প্রথম পাখিটিকে শনাক্ত করেন। এর মাধ্যমে দেশের পাখি তালিকায় যুক্ত হয় নতুন একটি নাম। এরপর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে বন্য প্রাণী আলোকচিত্রীরা এই পাখির সন্ধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছুটে আসছেন।২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর, ছোট কালী পেঁচার ছবি তুলতে রাজশাহীতে আসেন দুই তরুণ বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী—তানভীর তাসনিম অভি ও গাজী আল মাহমুদ মারুফ। অভির সংগ্রহে আগে থেকেই কালী পেঁচার ছবি থাকলেও মারুফ তা ক্যামেরাবন্দী করতে পারেননি। অভির সহযোগিতায় সেদিন মারুফের স্বপ্ন পূরণ হয়।ছবি তোলার পর দুজন হাঁটতে হাঁটতে চলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের বদ্ধভূমি এলাকার দিকে। সেখানে তারা বামুনি শালিক, মৌটুসি, মাছরাঙা ও কুড়া ঈগলসহ বেশ কয়েকটি পাখির ছবি তোলেন। এ সময় আকাশে উড়তে থাকা কয়েকটি শিকারি পাখির দিকে নজর পড়ে অভির। টেলিলেন্স তাক করে ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখতেই ক্যামেরাবন্দী হয় দুটি মধুবাজ ও একটি বিশাল আকৃতির শকুন।অভির বন্য প্রাণী আলোকচিত্র যাত্রা খুব বেশি দিনের না হলেও ইতোমধ্যে সে শতাধিক পাখির ছবি তুলেছে। ওই দিনটি তার জন্য ছিল বিশেষ—কারণ, উড়ন্ত শকুনের ছবিটি ছিল তার ১৫০তম পাখির আলোকচিত্র। শুরুতে ধারণা করা হয়, এটি হয়তো দুর্লভ বাংলা শকুন (White-rumped Vulture)। তবে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যায়—এর গায়ের রং ও ওড়ার ভঙ্গি দেশীয় শকুন বা হিমালয়ান গৃধিনীর সঙ্গে মেলে না।পরবর্তীতে অভি ছবিটি পাখিবিষয়ক কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেন। সেখানে অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মতামত ছিল প্রায় একবাক্যে—এটি আমেরিকান কালো শকুন।এই শকুন সাধারণত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এদের বিচরণভূমি। পালকহীন ধূসর মাথা ও গলা, চকচকে কালো শরীর এবং প্রায় পাঁচ ফুট ডানার বিস্তার—সব মিলিয়ে পাখিটি সহজেই নজর কাড়ে। মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকা এ শকুনগুলো সামাজিক স্বভাবের এবং দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে।রাজশাহীর আকাশে এমন একটি পাখির উপস্থিতি নিয়ে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মনিরুল হাসান খানের সঙ্গে। তিনি বলেন,“এটা তো নর্থ আমেরিকার পাখি। স্বাভাবিকভাবে এদেশের আকাশে থাকার কথা নয়।”তবে তিনি আরও যোগ করেন,“এ ধরনের ঘটনা একেবারে অস্বাভাবিকও নয়। বিশ্বজুড়ে বন্য প্রাণী চোরাকারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। কখনো কখনো পাচারের সময় ধরা পড়া প্রাণী বা পাখিকে পরে কোনো অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়। সম্ভবত এই আমেরিকান কালো শকুনটিও ভারত বা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে উদ্ধার হয়ে পরে প্রকৃতিতে ছাড়া পেয়েছে।”এই ব্যাখ্যার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। এমন অভিজ্ঞতার উদাহরণও আছে। ২০০২ সালের ৩ ডিসেম্বর নরসিংদীর চরসিন্দুর থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বালু বোরা (Common Sand Boa) সাপের জীবন্ত নমুনা উদ্ধার হয়—যা ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রাণী নয়। পরবর্তীতে জানা যায়, বেদে সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে সাপটি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল।প্রকৃতি তাই মাঝেমধ্যেই এমন রহস্যময় ঘটনার জন্ম দেয়। তবে মনোযোগী পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণই আমাদের প্রকৃত সত্যের কাছে পৌঁছে দেয়।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ 
প্রকাশকঃ ফিরোজ আল-মামুন 

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা