যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেকোনো সময় ইরানে সামরিক হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র—এমন আশঙ্কা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি। তার এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, যা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ ইরানে অবস্থানরত নিজ নিজ নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, ওইসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এরই মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরান আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ব্যতীত সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য সাময়িকভাবে আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার ফ্লাইট রাডার ২৪ এ তথ্য জানায়। ভারতের বৃহত্তম বিমান সংস্থা ইন্ডিগো জানিয়েছে, আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে তাদের একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট প্রভাবিত হতে পারে।
এর আগে বুধবার জার্মানি ইরানের আকাশসীমা ব্যবহারে নতুন সতর্কতা জারি করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে না।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি ইরান বর্তমানে সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখে রয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দমন-পীড়নের ফলে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার পশ্চিমা এক সামরিক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং হামলা যে কোনো সময় শুরু হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। ইসরাইলি এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে, যদিও সময়সূচি এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে নিজেদের কর্মী প্রত্যাহার শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন ইরানের বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হামলা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। বাইরের চাপ জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ওমান, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এসব ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত শক্তির প্রতীক হলেও একই সঙ্গে পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিও বহন করছে। গত বছর ইরান কাতারের আল উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয়। এরপর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা ইরানের রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক পদক্ষেপে এগোয়, তাহলে ওয়াশিংটনের সামনে ছয়টি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে—
১. মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান ও বি-৫২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে বিমান হামলা
২. পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ
৩. ড্রোনের মাধ্যমে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্ভুল হামলা
৪. সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের সামরিক যোগাযোগ ও কমান্ড সিস্টেম অচল করা
৫. বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে গোপন নাশকতামূলক অভিযান
৬. দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনায় আঘাত
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো একটি পথ বেছে নেওয়া হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন