বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কি এক নতুন বিতর্কিত অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে, নাকি এটি জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদা রক্ষার এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত—এই প্রশ্নের মধ্যেই চূড়ান্ত অবস্থান জানালো বাংলাদেশ। খেলোয়াড় ও দলের সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই সিদ্ধান্তে তারা অনড় রয়েছে।
এর ফলে ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম কোনো আইসিসি ইভেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল, যা দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় এক ধাক্কা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিশ্বকাপ সম্ভাব্য স্কোয়াডের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এক জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাস, নুরুল হাসান সোহানসহ একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের অবস্থান সরাসরি খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরা।
আইসিসি বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত জানাতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিলেও সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে ‘বাস্তব ও গুরুতর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বৈঠক শেষে ক্রীড়া উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই ঝুঁকিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, ভারতের মাটিতে খেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে নিরাপত্তা শঙ্কা রয়েছে, তা কোনো কল্পনাভিত্তিক বা অনুমাননির্ভর বিষয় নয়। এটি বাস্তব পরিস্থিতি ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, “এটি কোনো বায়বীয় বিশ্লেষণ নয়। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত।”
তিনি আরও জানান, এটি কেবল বিসিবির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়; এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনাটি ছিল ব্যাখ্যামূলক, সেখানে তাদের ব্যক্তিগত মতামত সিদ্ধান্ত নির্ধারণে মুখ্য বিষয় ছিল না। সরকারের দৃষ্টিতে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাই কোনোভাবেই ক্রিকেটারদের সম্ভাব্য বিপদের মুখে ঠেলে দিতে রাজি নন নীতিনির্ধারকরা।
ক্রীড়া উপদেষ্টার মতে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে এই আলোচনা ছিল গোপনীয় বা ‘প্রিভিলেজড কমিউনিকেশন’, যেখানে সরকার কেন এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ সরকারি এবং এটি অপরিবর্তনীয়।”
নিরাপত্তা শঙ্কার অন্যতম প্রধান উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে মোস্তাফিজুর রহমানের সাম্প্রতিক ঘটনা। গত ৩ জানুয়ারি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে হঠাৎ করেই বাদ পড়েন এই বাঁহাতি পেসার। সরকারের কাছে থাকা তথ্যে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, যখন স্বাগতিক দেশের বোর্ড নিজেদের ঘরোয়া লিগেই একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় বা অনিচ্ছুক থাকে, তখন পুরো বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আইসিসি কিংবা ভারত সরকার—কেউই এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কোনো নিরাপত্তা আশ্বাস দেয়নি বা আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশও করেনি।
তিনি আরও বলেন, “ভারত যদি মোস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে আমাদের ক্রিকেটার, সাংবাদিক ও দর্শকদের নিরাপত্তা দিতে পারবে—এই বিশ্বাস আমরা কিসের ভিত্তিতে করব? ভারত আমাদের বোঝানোর কোনো উদ্যোগই নেয়নি।”
এদিকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আইসিসির ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি আইসিসির আচরণকে ‘দ্বিমুখী’ উল্লেখ করে বলেন, ২১ জানুয়ারির বৈঠকে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, তা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। বুলবুলের দাবি, মোস্তাফিজ কোনো ইনজুরি বা ব্যক্তিগত কারণে দল ছাড়েননি; তাকে নিরাপত্তাজনিত কারণেই জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, গত ৪ জানুয়ারি থেকেই বিসিবি আইসিসির কাছে বিকল্প ভেন্যুর দাবি জানিয়ে আসছে। অতীতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বহুবার ভেন্যু পরিবর্তন বা হাইব্রিড মডেল ব্যবহারের নজির রয়েছে—১৯৯৬ ও ২০০৩ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও এর উদাহরণ।
বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে, ‘সি’ গ্রুপে থাকা ইংল্যান্ড, ইতালি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নেপালের বিপক্ষে ম্যাচগুলো ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করার। কিন্তু আইসিসি এখনো সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। উল্টো তারা চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে, যা একটি স্বাধীন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের জন্য অপমানজনক বলে মনে করছে বিসিবি।
বুলবুল বলেন, “মিটিংয়ে মোস্তাফিজের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ও গুরুত্বহীন বলা হয়েছে। কিন্তু এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যেখানে খেলা হচ্ছিল, সেই দেশের বোর্ডই ছিল একমাত্র কর্তৃপক্ষ।”
আইসিসি যে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, সেটিকে অযৌক্তিক ও এখতিয়ারবহির্ভূত বলে মনে করছেন বিসিবি সভাপতি। তিনি জানান, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবে। দল শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপ খেলতে মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও ক্রিকেটপ্রেমের কথা বিবেচনায় নিয়ে আইসিসি শেষ পর্যন্ত সুবিচার করবে—এমন আশাই এখনো করছেন বিসিবি প্রধান। তার মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে দল পাঠানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, “একটি বিশ্ব সংস্থা এভাবে হুট করে সময়সীমা চাপিয়ে দিতে পারে না। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা শ্রীলঙ্কার মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে চাই।”

রোববার, ১৫ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন