Taj Mahal বিশ্বের ইতিহাসে শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি এক আবেগময় দলিল। সাদা মার্বেলে নির্মিত এই সমাধিসৌধ মানুষের ভালোবাসা, শোক, আনুগত্য ও স্মৃতিকে পাথরের ভাষায় রূপ দিয়েছে। ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া এই মহাকীর্তি আজ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে আছে এক গভীর বেদনার গল্প, এক শোকাহত স্বামীর গল্প, যিনি তাঁর প্রয়াত স্ত্রীকে সম্মান জানাতে এমন এক স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন, যা চিরন্তন ভালোবাসা ও নিবেদনের প্রতীক হয়ে থাকবে।
মুঘল সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী রাজবংশ। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছে। এই সাম্রাজ্যের শাসকেরা শুধু যুদ্ধজয়ী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের মহান পৃষ্ঠপোষক।
এই ধারার শীর্ষে ছিলেন Shah Jahan (১৫৯২–১৬৬৬)। তিনি ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্য শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে মুঘল ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়, যে সময়ে স্থাপত্য, নান্দনিকতা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। লাল কেল্লা, জামে মসজিদ, এসব ছিল তাঁর ক্ষমতা ও রুচির প্রকাশ; কিন্তু তাজমহল ছিল তাঁর হৃদয়ের ভাষা।
শাসনামলের আরেকটি দিক ছিল দাক্ষিণাত মালভূমিতে অবস্থিত পারস্য-ঘেঁষা মুসলিম সুলতানাতগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান। সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে এসব যুদ্ধ চলছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে।
শাহজাহানের জন্মনাম ছিল শাহাব-উদ-দীন মুহাম্মদ খুররম। ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া এই রাজপুত্র ১৬০৭ সালে বাগদান করেন আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।
আরজুমান্দ বানু বেগমের জন্ম আগ্রায়, এক পারস্যীয় অভিজাত পরিবারে। তিনি ছিলেন আবু’ল-হাসান আসাফ খানের কন্যা—যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী অভিজাত ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। আসাফ খান শুধু একজন রাজপুরুষই নন; তিনি রাজনীতি ও দরবারি কূটনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জাহাঙ্গীরের শাসনামল থেকে শুরু করে শাহজাহানের সিংহাসনে আরোহণ পর্যন্ত তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৬১২ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে, দরবারি জ্যোতিষীদের মতে শুভ ক্ষণে, খুররম ও আরজুমান্দ বানু বেগমের বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহোত্তর উৎসব শেষে যুবরাজ তাঁর স্ত্রীকে যে উপাধি দেন, তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে মুমতাজ মহল, অর্থাৎ “প্রাসাদের নির্বাচিতা”।
মুমতাজ মহল ছিলেন শাহজাহানের তৃতীয় স্ত্রী। কিন্তু তাঁর প্রতি সম্রাটের ভালোবাসা ও অনুরাগ এতটাই গভীর ছিল যে, অন্য স্ত্রীদের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। মুমতাজ ছিলেন তাঁর আবেগের কেন্দ্র, আস্থার আশ্রয়।
১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানের সিংহাসনে আরোহণের পর মুমতাজ মহল সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা লাভ করেন। তবু তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেননি। বরং তিনি ছিলেন স্বামীর নীরব উপদেষ্টা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষক। দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তিনি প্রায়ই দরবারে হস্তক্ষেপ করতেন।
রাজকীয় দায়িত্ব হিসেবে উত্তরাধিকার প্রদান ছিল তাঁর প্রধান কর্তব্য। ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ১৪টি সন্তান জন্ম নেয় আট পুত্র ও ছয় কন্যা। এর মধ্যে সাতজন জন্মের সময় বা শৈশবে মারা যায়। এই বারবার সন্তান ধারণ ও হারানোর মধ্যেও মুমতাজ মহল ছিলেন স্বামীর অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
এমনকি সামরিক অভিযানের সময়ও তিনি শাহজাহানের সফরসঙ্গী হতেন। দরবারি ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন—তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর, আবেগময় ও অন্তরঙ্গ; এক সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর মধ্যে এমন নিবিড় সম্পর্ক ছিল বিরল।
১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে, চতুর্দশ সন্তানের গর্ভে থাকা অবস্থায়, মুমতাজ মহল স্বামীর সঙ্গে দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে যান। সেখানেই, বর্তমান মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরে, মুঘল বাহিনী অবস্থান করছিল।
বুরহানপুরে পৌঁছানোর পরপরই তাঁর প্রসব বেদনা শুরু হয়। টানা ৩০ ঘণ্টার যন্ত্রণাদায়ক প্রসবের পর, ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন তিনি প্রসবজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন। সদ্যজাত কন্যার নাম ছিল গওহারা বেগম। মৃত্যুকালে মুমতাজ মহলের বয়স ছিল ৩৮ বছর।
প্রথমে তাঁকে বুরহানপুরের তাপ্তি নদীর তীরে জাইনাবাদ নামক একটি প্রাচীরবেষ্টিত বাগানে অস্থায়ীভাবে সমাহিত করা হয়। কিন্তু শাহজাহানের কাছে এটি কখনোই তাঁর স্ত্রীর চূড়ান্ত বিশ্রামস্থল হওয়ার কথা ছিল না।
সম্রাটের নির্দেশে ডিসেম্বর ১৬৩১-এ মুমতাজ মহলের দেহাবশেষ উত্তোলন করে সোনার কফিনে ভরে আগ্রায় আনা হয়। পুত্র শাহ সুজার তত্ত্বাবধানে সেই কফিন যমুনা নদীর তীরে একটি ছোট ভবনে পুনরায় দাফন করা হয়। এদিকে শাহজাহান আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যান।
বিদ্রোহ দমন শেষে বিজয়ী হলেও, তাঁর অন্তর শান্ত হয়নি। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায়, এই সময় তিনি গভীর বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হন। প্রায় এক বছর তিনি নিজেকে নিভৃত করে রাখেন। তাঁর চুল পেকে যায়, চোখে স্থায়ী শোকের ছাপ বসে।
এই শোক থেকেই জন্ম নেয় এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, মুমতাজ মহলের জন্য এমন একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ, যা ভালোবাসাকে অমর করে রাখবে।
যমুনা নদীর তীরের সেই সমাধিস্থলেই ধীরে ধীরে তাজমহলের অবয়ব গড়ে ওঠে। নির্মাণকাজ চলে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে।
প্রায় ৩২২ কিলোমিটার দূরের খনি থেকে সাদা মার্বেল আনা হয় হাতি দিয়ে বহন করে। হাজার হাজার শ্রমিক, কারিগর, স্থপতি ও শিল্পী এতে যুক্ত ছিলেন।
দক্ষ ক্যালিগ্রাফাররা কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ করেন মার্বেলের গায়ে, ভবনের বাইরের অংশে ও অভ্যন্তরে। পাথরশিল্পীরা নিখুঁত ফুলেল নকশা ও জ্যামিতিক অলংকরণ খোদাই করে তাতে বসান মূল্যবান ও দুর্লভ পাথর। পারস্য, ইসলামি ও ভারতীয় নান্দনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে এই স্থাপত্যে।
১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাজমহলের নির্মাণ সম্পন্ন হয় এর নির্মাতার জীবদ্দশাতেই। শাহজাহান এমন এক স্থাপনা উপহার দেন পৃথিবীকে, যা ভালোবাসা, নিবেদন ও বেদনার স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে।
তাজমহলের কেন্দ্রে যে সমাধিফলক দেখা যায়, তা প্রতীকী। মুমতাজ মহলের প্রকৃত দেহাবশেষ রয়েছে নিচের ক্রিপ্টে—নীরব, অদৃশ্য, অথচ চিরস্থায়ী।
তাজমহল সম্পন্ন হওয়ার কিছুদিন পরই শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন। চার পুত্রের মধ্যে সিংহাসনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আওরঙ্গজেব বিজয়ী হন এবং পিতাকে আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দি করে রাখেন। বলা হয়, দুর্গের জানালা দিয়ে প্রতিদিন তিনি যমুনার ওপারে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল, মুমতাজ মহলের পাশে সমাহিত হওয়া। আওরঙ্গজেব সেই ইচ্ছা পূরণ করেন। আজ তাঁদের দু’জনের নাম পাশাপাশি, নিচের নীরব সমাধিতে।
আজ তাজমহল বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি। ১৯৯৩ সালে UNESCO পুরো সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৪–২০২৫ সালে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ এটি পরিদর্শন করেছে, এটি ভারতের সর্বাধিক দর্শনীয় স্মৃতিসৌধ।
তাজমহল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাম্রাজ্য পতিত হয়, ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; কিন্তু গভীর ভালোবাসা পাথরের গায়েও অমর হয়ে থাকতে পারে।

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন