গণবার্তা

তারিক বিন জিয়াদ

ইউরোপের দরজা খুলে দেওয়া এক মুসলিম সেনাপতির ইতিহাস

ইউরোপের দরজা খুলে দেওয়া এক মুসলিম সেনাপতির ইতিহাস
ছবিঃ গণবার্তা গ্রাফিক্স

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের অবদান ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন সেই বিরল ইতিহাসনির্ধারক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর নেতৃত্বে ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিমদের প্রবেশ কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না; এটি ছিল ইউরোপে নতুন জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সূচনালগ্ন।

আজকের স্পেন ও পর্তুগাল অঞ্চল—যা একসময় ‘আল-আন্দালুস’ নামে পরিচিত ছিল—এই ঐতিহাসিক ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে।


বেরবার ভূমি থেকে ইতিহাসের মঞ্চে

তারিক বিন জিয়াদের জন্ম আনুমানিক ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায়, সম্ভবত বর্তমান আলজেরিয়া অথবা মরক্কো অঞ্চলে। তিনি ছিলেন বেরবার জনগোষ্ঠীর সন্তান।

বেরবাররা সাহসিকতা ও যুদ্ধকুশলতার জন্য সুপরিচিত ছিল। ইসলাম উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর তাদের একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করে এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ও শৃঙ্খলা তাদের যুদ্ধক্ষমতাকে আরও সংগঠিত ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠ করে তোলে।

তারিক বিন জিয়াদের প্রতিভা খুব দ্রুতই উমাইয়া প্রশাসনের নজরে আসে। উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর মূসা ইবনে নুসাইর তাঁকে সামরিক দায়িত্ব প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে তাঞ্জিয়া অঞ্চলের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। এই নিয়োগই ভবিষ্যতে স্পেন অভিযানের কৌশলগত ভিত্তি গড়ে দেয়।


স্পেনের রাজনৈতিক সংকট: এক ঐতিহাসিক সুযোগ

সে সময় স্পেন ছিল ভিসিগথ রাজ্যের অধীনে। বাহ্যিকভাবে রাজ্যটি শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে ছিল—

  • সিংহাসন নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

  • আঞ্চলিক বিদ্রোহ

  • দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো

  • সাধারণ জনগণের অসন্তোষ

এ ছাড়া ধর্মীয় নিপীড়ন ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে ইহুদি ও নিম্নশ্রেণির জনগণের বড় একটি অংশ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বিরূপ ছিল। রাজা রডেরিক ক্ষমতায় এলেও এই অস্থিরতা দূর করতে ব্যর্থ হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতাই মুসলিম অভিযানের পথকে অনেকটাই সুগম করে তোলে।


জিব্রাল্টার অতিক্রম: ইতিহাসের এক প্রতীকী মুহূর্ত

৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদ প্রায় সাত হাজার সৈন্য নিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করেন। যে পাহাড়ে তিনি অবতরণ করেন, সেটি আজও তাঁর নাম বহন করছে—জাবাল তারিক, যা পরবর্তীতে ইংরেজিতে ‘জিব্রাল্টার’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই নামটিই ইতিহাসের একটি জীবন্ত স্মারক হয়ে আছে এবং মুসলিম অভিযাত্রার স্মৃতি বহন করে চলেছে।


“পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু”

তারিক বিন জিয়াদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে পরিচিত ঘটনা হলো নৌকা পুড়িয়ে দেওয়ার কাহিনি। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে প্রতীকী বা পরবর্তী যুগের বর্ণনা বলে মনে করেন, তবুও এটি নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সংকল্পের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

সৈন্যদের উদ্দেশে তাঁর কথিত ভাষণের সারমর্ম ছিল—

“পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু। তোমাদের জন্য বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হলো সাহস ও বিজয়।”

এই বক্তব্য মুসলিম সেনাদের মনোবল দৃঢ় করে তোলে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করে।


গুয়াদালেতে যুদ্ধ: ইতিহাস বদলে দেওয়া সংঘর্ষ

স্পেন বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল গুয়াদালেতে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে—

  • তারিক বিন জিয়াদের বাহিনী ছিল আনুমানিক সাত থেকে বারো হাজার

  • রাজা রডেরিকের বাহিনী ছিল সংখ্যায় কয়েকগুণ বেশি

সংখ্যাগত দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল—

  • সুপরিকল্পিত কৌশল

  • দ্রুতগামী ও নমনীয় যুদ্ধপদ্ধতি

  • শত্রুপক্ষের অভ্যন্তরীণ বিভাজন

রাজা রডেরিক যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। এর পরপরই ভিসিগথ শাসন দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং স্পেন কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে যায়।


স্পেনে মুসলিম শাসনের বিস্তার

গুয়াদালেতে বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী দ্রুত স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করে নেয়—টলেডো, কর্ডোবা, সেভিল ও গ্রানাডা। অনেক শহরই সামান্য প্রতিরোধ অথবা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।

পরবর্তীতে মূসা ইবনে নুসাইর অতিরিক্ত বাহিনী নিয়ে স্পেনে আগমন করেন এবং প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত করেন। এর মাধ্যমেই আল-আন্দালুসের ভিত্তি সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।


ধর্মীয় সহাবস্থান ও প্রশাসনিক নীতি

মুসলিম শাসনামলে আল-আন্দালুসে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে ওঠে। অমুসলিম জনগণ নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা পায় এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

এই সহনশীল নীতিই আল-আন্দালুসকে একটি স্থিতিশীল ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিণত করে।


জ্ঞান ও সভ্যতার নতুন অধ্যায়

স্পেনে মুসলিম শাসন প্রায় আট শতাব্দী স্থায়ী হয়। এই দীর্ঘ সময়ে ইউরোপে জ্ঞানচর্চার এক নতুন ধারা বিকশিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, স্থাপত্য ও কৃষি প্রযুক্তিতে মুসলিম পণ্ডিতদের অবদান ইউরোপীয় সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।

কর্ডোবা একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে হাজার হাজার গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল।


ভাষা ও সংস্কৃতিতে প্রভাব

মুসলিম শাসনের ফলে স্প্যানিশ ভাষায় অসংখ্য আরবি শব্দ প্রবেশ করে—যেমন ‘আজুকার’ (চিনি), ‘আলজেব্রা’ (বীজগণিত) এবং ‘আলকালদে’ (মেয়র)। এসব শব্দ আজও স্প্যানিশ ভাষায় ব্যবহৃত হয়, যা মুসলিম শাসনের সাংস্কৃতিক প্রভাবের স্থায়ী নিদর্শন।


স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ

মুসলিম শাসনামলে নির্মিত স্থাপত্যকর্ম আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। কর্ডোবার গ্র্যান্ড মসজিদ, আলহাম্ব্রা প্রাসাদ এবং সেভিলের মিনার ইসলামী শিল্প, নান্দনিকতা ও প্রকৌশল দক্ষতার অনন্য উদাহরণ।


তারিক বিন জিয়াদের শেষ জীবন

তারিক বিন জিয়াদের শেষ জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। ধারণা করা হয়, তিনি আনুমানিক ৭২০ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসে তাঁর শেষ জীবন নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়—কেউ বলেন তিনি সাধারণ জীবনযাপন করেন, কেউ বলেন তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। তবে তাঁর সামরিক ও ঐতিহাসিক অবদান প্রশ্নাতীত।


ইতিহাসে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব

তারিক বিন জিয়াদকে কেবল একজন সেনাপতি হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না। তিনি ইউরোপে মুসলিম উপস্থিতির সূচনা করেন, একটি নতুন সভ্যতার দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন।

তারিকের অভিযানের ফলেই ইউরোপে গ্রিক ও প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষিত ও বিকশিত হয়, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি রচনা করে।


উপসংহার

তারিক বিন জিয়াদ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সাহস, নেতৃত্ব ও বিশ্বাসের শক্তিকে ইতিহাসে রূপ দিয়েছেন। উত্তর আফ্রিকার এক বেরবার যুবক থেকে ইউরোপ বিজয়ের সেনাপতি হয়ে ওঠার এই কাহিনি শুধু সামরিক ইতিহাস নয়; এটি মানব সভ্যতার রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জিব্রাল্টারের পাহাড় আজও যেন সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য বহন করে যা ছিলো দৃঢ় বিশ্বাস, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের বিরল আখ্যান।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


ইউরোপের দরজা খুলে দেওয়া এক মুসলিম সেনাপতির ইতিহাস

প্রকাশের তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের অবদান ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন সেই বিরল ইতিহাসনির্ধারক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর নেতৃত্বে ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিমদের প্রবেশ কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না; এটি ছিল ইউরোপে নতুন জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সূচনালগ্ন।আজকের স্পেন ও পর্তুগাল অঞ্চল—যা একসময় ‘আল-আন্দালুস’ নামে পরিচিত ছিল—এই ঐতিহাসিক ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে।বেরবার ভূমি থেকে ইতিহাসের মঞ্চেতারিক বিন জিয়াদের জন্ম আনুমানিক ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায়, সম্ভবত বর্তমান আলজেরিয়া অথবা মরক্কো অঞ্চলে। তিনি ছিলেন বেরবার জনগোষ্ঠীর সন্তান।বেরবাররা সাহসিকতা ও যুদ্ধকুশলতার জন্য সুপরিচিত ছিল। ইসলাম উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর তাদের একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করে এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ও শৃঙ্খলা তাদের যুদ্ধক্ষমতাকে আরও সংগঠিত ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠ করে তোলে।তারিক বিন জিয়াদের প্রতিভা খুব দ্রুতই উমাইয়া প্রশাসনের নজরে আসে। উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর মূসা ইবনে নুসাইর তাঁকে সামরিক দায়িত্ব প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে তাঞ্জিয়া অঞ্চলের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। এই নিয়োগই ভবিষ্যতে স্পেন অভিযানের কৌশলগত ভিত্তি গড়ে দেয়।স্পেনের রাজনৈতিক সংকট: এক ঐতিহাসিক সুযোগসে সময় স্পেন ছিল ভিসিগথ রাজ্যের অধীনে। বাহ্যিকভাবে রাজ্যটি শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল গভীর সংকটে নিমজ্জিত।প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে ছিল—সিংহাসন নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বআঞ্চলিক বিদ্রোহদুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোসাধারণ জনগণের অসন্তোষএ ছাড়া ধর্মীয় নিপীড়ন ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে ইহুদি ও নিম্নশ্রেণির জনগণের বড় একটি অংশ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বিরূপ ছিল। রাজা রডেরিক ক্ষমতায় এলেও এই অস্থিরতা দূর করতে ব্যর্থ হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতাই মুসলিম অভিযানের পথকে অনেকটাই সুগম করে তোলে।জিব্রাল্টার অতিক্রম: ইতিহাসের এক প্রতীকী মুহূর্ত৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদ প্রায় সাত হাজার সৈন্য নিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করেন। যে পাহাড়ে তিনি অবতরণ করেন, সেটি আজও তাঁর নাম বহন করছে—জাবাল তারিক, যা পরবর্তীতে ইংরেজিতে ‘জিব্রাল্টার’ নামে পরিচিতি লাভ করে।এই নামটিই ইতিহাসের একটি জীবন্ত স্মারক হয়ে আছে এবং মুসলিম অভিযাত্রার স্মৃতি বহন করে চলেছে।“পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু”তারিক বিন জিয়াদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে পরিচিত ঘটনা হলো নৌকা পুড়িয়ে দেওয়ার কাহিনি। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে প্রতীকী বা পরবর্তী যুগের বর্ণনা বলে মনে করেন, তবুও এটি নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সংকল্পের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।সৈন্যদের উদ্দেশে তাঁর কথিত ভাষণের সারমর্ম ছিল—“পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু। তোমাদের জন্য বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হলো সাহস ও বিজয়।”এই বক্তব্য মুসলিম সেনাদের মনোবল দৃঢ় করে তোলে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করে।গুয়াদালেতে যুদ্ধ: ইতিহাস বদলে দেওয়া সংঘর্ষস্পেন বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল গুয়াদালেতে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে—তারিক বিন জিয়াদের বাহিনী ছিল আনুমানিক সাত থেকে বারো হাজাররাজা রডেরিকের বাহিনী ছিল সংখ্যায় কয়েকগুণ বেশিসংখ্যাগত দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল—সুপরিকল্পিত কৌশলদ্রুতগামী ও নমনীয় যুদ্ধপদ্ধতিশত্রুপক্ষের অভ্যন্তরীণ বিভাজনরাজা রডেরিক যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। এর পরপরই ভিসিগথ শাসন দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং স্পেন কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে যায়।স্পেনে মুসলিম শাসনের বিস্তারগুয়াদালেতে বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী দ্রুত স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করে নেয়—টলেডো, কর্ডোবা, সেভিল ও গ্রানাডা। অনেক শহরই সামান্য প্রতিরোধ অথবা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।পরবর্তীতে মূসা ইবনে নুসাইর অতিরিক্ত বাহিনী নিয়ে স্পেনে আগমন করেন এবং প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত করেন। এর মাধ্যমেই আল-আন্দালুসের ভিত্তি সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।ধর্মীয় সহাবস্থান ও প্রশাসনিক নীতিমুসলিম শাসনামলে আল-আন্দালুসে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে ওঠে। অমুসলিম জনগণ নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা পায় এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে।এই সহনশীল নীতিই আল-আন্দালুসকে একটি স্থিতিশীল ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিণত করে।জ্ঞান ও সভ্যতার নতুন অধ্যায়স্পেনে মুসলিম শাসন প্রায় আট শতাব্দী স্থায়ী হয়। এই দীর্ঘ সময়ে ইউরোপে জ্ঞানচর্চার এক নতুন ধারা বিকশিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, স্থাপত্য ও কৃষি প্রযুক্তিতে মুসলিম পণ্ডিতদের অবদান ইউরোপীয় সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।কর্ডোবা একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে হাজার হাজার গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল।ভাষা ও সংস্কৃতিতে প্রভাবমুসলিম শাসনের ফলে স্প্যানিশ ভাষায় অসংখ্য আরবি শব্দ প্রবেশ করে—যেমন ‘আজুকার’ (চিনি), ‘আলজেব্রা’ (বীজগণিত) এবং ‘আলকালদে’ (মেয়র)। এসব শব্দ আজও স্প্যানিশ ভাষায় ব্যবহৃত হয়, যা মুসলিম শাসনের সাংস্কৃতিক প্রভাবের স্থায়ী নিদর্শন।স্থাপত্যের স্বর্ণযুগমুসলিম শাসনামলে নির্মিত স্থাপত্যকর্ম আজও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। কর্ডোবার গ্র্যান্ড মসজিদ, আলহাম্ব্রা প্রাসাদ এবং সেভিলের মিনার ইসলামী শিল্প, নান্দনিকতা ও প্রকৌশল দক্ষতার অনন্য উদাহরণ।তারিক বিন জিয়াদের শেষ জীবনতারিক বিন জিয়াদের শেষ জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। ধারণা করা হয়, তিনি আনুমানিক ৭২০ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসে তাঁর শেষ জীবন নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়—কেউ বলেন তিনি সাধারণ জীবনযাপন করেন, কেউ বলেন তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। তবে তাঁর সামরিক ও ঐতিহাসিক অবদান প্রশ্নাতীত।ইতিহাসে তাঁর প্রকৃত গুরুত্বতারিক বিন জিয়াদকে কেবল একজন সেনাপতি হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না। তিনি ইউরোপে মুসলিম উপস্থিতির সূচনা করেন, একটি নতুন সভ্যতার দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন।তারিকের অভিযানের ফলেই ইউরোপে গ্রিক ও প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষিত ও বিকশিত হয়, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় রেনেসাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি রচনা করে।উপসংহারতারিক বিন জিয়াদ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সাহস, নেতৃত্ব ও বিশ্বাসের শক্তিকে ইতিহাসে রূপ দিয়েছেন। উত্তর আফ্রিকার এক বেরবার যুবক থেকে ইউরোপ বিজয়ের সেনাপতি হয়ে ওঠার এই কাহিনি শুধু সামরিক ইতিহাস নয়; এটি মানব সভ্যতার রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।জিব্রাল্টারের পাহাড় আজও যেন সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য বহন করে যা ছিলো দৃঢ় বিশ্বাস, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের বিরল আখ্যান।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ 
প্রকাশকঃ ফিরোজ আল-মামুন 

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা