ইসলামী ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন কেবল সামরিক বিজয়ের কাহিনি নয়—বরং একটি নতুন সভ্যতার সূচনার ইতিহাস। মুহাম্মদ বিন কাসিম সেই ধরনেরই এক কিংবদন্তি সেনাপতি। অল্প বয়সে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারের পথ উন্মুক্ত করেন।
এই ফিচারে তাঁর জীবন, নেতৃত্ব, সিন্ধু বিজয়, প্রশাসনিক নীতি এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিম জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে আরব উপদ্বীপের তাইফ নগরীতে। তিনি আরবের প্রখ্যাত সাকিফ (থাকিফ) গোত্রের সদস্য ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি সামরিক শিক্ষা ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
তাঁর অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন উমাইয়া সাম্রাজ্যের শক্তিশালী প্রশাসক হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ। হাজ্জাজ তাঁর প্রতিভা, শৃঙ্খলা ও দৃঢ় মনোভাব খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন। তরুণ বয়সেই মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব পালনে দক্ষতা প্রদর্শন করেন।
অষ্টম শতাব্দীর সূচনালগ্নে আরব বণিকরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথ ব্যবহার করতেন। আরব ও ভারতীয় উপকূলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বহু পুরোনো হলেও রাজনৈতিকভাবে তা ছিল বিচ্ছিন্ন।
এই সময় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে—শ্রীলঙ্কা থেকে আগত মুসলিম নারী ও শিশুবাহী একটি জাহাজ সিন্ধুর উপকূলে দস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়। এই ঘটনার পর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ সিন্ধুর শাসক রাজা দাহির-এর কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। কিন্তু কার্যকর প্রতিকার না হওয়ায় উমাইয়া খিলাফত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হয় মাত্র ১৭ বছর বয়সী মুহাম্মদ বিন কাসিমকে—যা ইসলামী সামরিক ইতিহাসে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।
৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রায় ৬,০০০ সৈন্য নিয়ে সিন্ধুর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। তাঁর বাহিনীতে ছিল অশ্বারোহী ও উটবাহিনী, পাশাপাশি উন্নত অবরোধযন্ত্র—বিশেষ করে ‘মঞ্জনীক’ (catapult)—যা দুর্গ দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রথম বড় সাফল্য আসে দেবল বন্দর দখলের মাধ্যমে। দেবল ছিল সিন্ধুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। দেবল পতনের পর মুসলিম বাহিনী দ্রুত নীরুন, সিউইস্তান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে।
সিন্ধু বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয় রাজা দাহিরের বাহিনীর সঙ্গে। বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলের নিকটে এই সংঘর্ষ ঘটে। মুহাম্মদ বিন কাসিম কৌশলগত পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর মাধ্যমে দাহিরের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে দাহির নিহত হন।
এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে সিন্ধু অঞ্চলে মুসলিম শাসনের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়।
মুহাম্মদ বিন কাসিম কেবল একজন বিজয়ী সেনাপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিচক্ষণ প্রশাসকও। বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধমূলক নীতি অনুসরণ না করে বাস্তববাদী ও সহনশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান
মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে সুরক্ষা দেওয়া
স্থানীয় প্রশাসকদের অনেক ক্ষেত্রে বহাল রাখা
সংগঠিত করব্যবস্থা চালু করা
কৃষি ও বাণিজ্য পুনর্গঠন
ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, তিনি স্থানীয় জনগণকে “আহলে কিতাব”-এর অনুরূপ সুরক্ষা প্রদানের নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এর ফলে বিজিত অঞ্চলে দ্রুত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে আরব ও ভারতীয় সভ্যতার মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এর ফলস্বরূপ—
জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আদান-প্রদান বৃদ্ধি পায়
বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত হয়
প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় শুরু হয়
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই যোগাযোগ ইসলামের বিস্তার, সুফি আন্দোলনের প্রসার এবং উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খিলাফতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। খলিফা পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন তাঁর পৃষ্ঠপোষক হাজ্জাজের নীতির বিরোধিতা করে।
তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়ে তিনি নিহত হন; আবার কেউ বলেন বন্দিত্বের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। মাত্র বিশ বছর বয়সে তাঁর জীবনের অবসান ঘটে—যা ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।
মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সাধারণত বলা হয়—
“ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পথপ্রদর্শক।”
তাঁর সিন্ধু বিজয় পরবর্তী মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। মাহমুদ গজনভি, মুহাম্মদ ঘুরি এবং দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠাতাদের ইতিহাসে তাঁর অভিযানের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—
তরুণ বয়সেও নেতৃত্ব সম্ভব
সামরিক বিজয়ের পর ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন অপরিহার্য
সংস্কৃতি ও ধর্মের সহাবস্থান স্থিতিশীলতা আনে
কৌশল, শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা বিজয়ের মূল শক্তি
মুহাম্মদ বিন কাসিম ছিলেন এক অসাধারণ তরুণ সেনাপতি, যার সিন্ধু বিজয় কেবল একটি সামরিক সাফল্য নয়—বরং একটি নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা। তাঁর নেতৃত্বে আরব ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে যে সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল, তা পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।
ইসলামী ইতিহাসে তাঁর নাম আজও সাহস, নেতৃত্ব এবং ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন