ইসলামী ইতিহাসে পূর্বভারতের রাজনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে যে নামটি বিশেষভাবে যুক্ত, তিনি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে তাঁর সামরিক অভিযান বাংলা ও বিহারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে।
তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডকে ঘিরে যেমন গৌরবের বর্ণনা রয়েছে, তেমনি বিতর্কও রয়েছে। বিশেষত নালন্দা মহাবিহারের ধ্বংসপ্রসঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের এই অধ্যায়কে আবেগ নয়, বরং দলিল, প্রাচীন উৎস ও আধুনিক গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
নালন্দা মহাবিহার ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। একইভাবে বিক্রমশীলা মহাবিহারও বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
বখতিয়ার খলজির সময়কার প্রধান মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্র হলো মিনহাজ-উস-সিরাজ রচিত তাবাকাত-ই-নাসিরী। এখানে বিহার বিজয়ের উল্লেখ আছে এবং একটি ‘বিহার দুর্গ’ দখলের কথা বলা হয়েছে, যেখানে বহু ব্রাহ্মণ ও শাস্ত্র পাওয়া যায়।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—
মিনহাজ কোথাও স্পষ্টভাবে ‘নালন্দা’ নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি যে ‘বিহার’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটি অনেক ক্ষেত্রে একটি সামরিক স্থাপনা বা ধর্মীয় আবাসনকেন্দ্র বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ফলে সরাসরি নালন্দা ধ্বংসের দায় আরোপের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন।
আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়—নালন্দা একাধিকবার আক্রমণের শিকার হয়েছিল। গুপ্ত-পরবর্তী যুগ থেকে পাল যুগ পর্যন্ত এটি বহুবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।
কিছু গবেষকের মতে, নালন্দার অবক্ষয় শুরু হয় বখতিয়ারের অভিযানের আগেই, যখন পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বৌদ্ধ পৃষ্ঠপোষকতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেলেও তা একক আক্রমণের ফল কিনা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়ের অংশ—এ বিষয়ে একমত হওয়া যায়নি।
কিছু ইতিহাসবিদ (যেমন আর.সি. মজুমদার) বখতিয়ারকে ধ্বংসের জন্য দায়ী করেন।
অন্যদিকে কয়েকজন গবেষক যুক্তি দেন—
‘বিহার’ মানেই নালন্দা নয়
আক্রমণ সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে হতে পারে
নালন্দার পতন ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফল
অতএব, দৃঢ়ভাবে বলা যায়—
বখতিয়ার খলজি নালন্দা মহাবিহার ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংস করেছেন—এমন প্রত্যক্ষ ও নির্ভুল সমসাময়িক দলিল নেই।
ইতিহাসে তাঁর নামের সঙ্গে নালন্দা ধ্বংস জড়িয়ে থাকলেও বিষয়টি এখনো গবেষণার আলোচ্য এবং নিশ্চিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বাংলা বিজয় বখতিয়ার খলজির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দ্বাদশ শতকের শেষভাগে বাংলায় সেন রাজবংশের শাসন চলছিল। রাজধানী ছিল নবদ্বীপ (বর্তমান নদীয়া)। রাজা লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বয়োবৃদ্ধ শাসক। প্রশাসনিকভাবে সেন সাম্রাজ্য তখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, বিশেষত সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি কমে যায়।
মিনহাজ-উস-সিরাজের বিবরণ অনুযায়ী, বখতিয়ার খুব অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দ্রুতগতির আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করেন।
বলা হয়, তিনি বণিকের ছদ্মবেশে রাজধানীর নিকটে পৌঁছান। সেনাদের প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই রাজপ্রাসাদ এলাকায় আক্রমণ চালানো হয়।
এই আকস্মিকতা ছিল তাঁর প্রধান কৌশল।
আক্রমণের সময় লক্ষ্মণ সেন সম্ভবত রাজপ্রাসাদে ভোজনরত ছিলেন। আকস্মিক হামলার মুখে তিনি পূর্ববাংলার দিকে (সম্ভবত বিক্রমপুর অঞ্চলে) সরে যান।
এই ঘটনা বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে দ্রুত পরিবর্তন করে দেয়।
নবদ্বীপ দখলের পর বখতিয়ার উত্তর বাংলার লখনৌতি (গৌড়) অঞ্চলে প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন।
গৌড় পরবর্তী সময়ে বাংলা মুসলিম শাসনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বিজয়ের পর বখতিয়ার ব্যাপক গণহত্যা বা ধর্মান্তরের নীতি গ্রহণ করেন—এমন নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। বরং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষণ পাওয়া যায়।
স্থানীয় জমিদার ও প্রশাসকদের অনেকে বহাল থাকেন
কৃষিভিত্তিক রাজস্বব্যবস্থা অব্যাহত থাকে
সামরিক অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠে
এই প্রশাসনিক রূপান্তরই পরবর্তীকালে বাংলায় মুসলিম শাসনের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলা বিজয়ের পর বখতিয়ার তিব্বতের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। ধারণা করা হয়, তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে তিব্বতের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, খাদ্যাভাব ও রোগব্যাধির কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। প্রত্যাবর্তনের পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন এবং ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে নিহত বা মৃত্যুবরণ করেন।
বখতিয়ার খলজি একটি জটিল ঐতিহাসিক চরিত্র।
তাঁকে একদিকে বাংলা বিজয়ের নায়ক হিসেবে দেখা হয়; অন্যদিকে নালন্দা ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
তবে দলিলসম্মত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
নালন্দা ধ্বংসের বিষয়ে নিশ্চিত সমসাময়িক প্রমাণ অনুপস্থিত
নবদ্বীপ বিজয় ছিল দ্রুত ও কৌশলগত
বাংলা মুসলিম শাসনের ভিত্তি তাঁর হাতেই স্থাপিত হয়
ইতিহাসের আলোচনায় আবেগ নয়, বরং প্রমাণনির্ভর বিশ্লেষণই গ্রহণযোগ্য।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির জীবন পূর্বভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনের অধ্যায়।
বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেন, তা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়।
নালন্দা প্রসঙ্গে বিতর্ক থাকলেও প্রামাণ্য সমসাময়িক দলিলের আলোকে বিষয়টি এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন নয়—এটি ইতিহাস গবেষণার আলোচ্য বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলা বিজয় ছিল সামরিক কৌশল, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দ্রুত অভিযানের এক অসাধারণ উদাহরণ—যা উপমহাদেশের ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করেছে।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন