ইসলামী সামরিক ইতিহাসে কিছু বিজয় কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক রূপান্তরের সূচনা। আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে মিশর বিজয় তেমনই একটি ঘটনা। তাঁর অভিযান শুধু একটি শক্তিশালী বাইজেন্টাইন প্রদেশ দখল নয়; এটি ছিল নতুন প্রশাসনিক কাঠামো, করব্যবস্থা ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক বাস্তব উদাহরণ
এই পর্বে আমরা মিশর বিজয়ের প্রেক্ষাপট, আলেকজান্দ্রিয়া দখল, প্রশাসনিক সংস্কার এবং তাঁর শাসনদর্শন বিশ্লেষণ করব।
সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে মিশর ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। নীলনদের উর্বর ভূমি এবং শস্য উৎপাদনের কারণে এটি ছিল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি। আলেকজান্দ্রিয়া ছিল রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র।
কিন্তু বাইজেন্টাইন প্রশাসনের ধর্মীয় নীতির কারণে স্থানীয় কপটিক খ্রিস্টান জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ধর্মতাত্ত্বিক মতভেদের কারণে কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে স্থানীয় চার্চের বিরোধ বৃদ্ধি পায়। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা মুসলিম অভিযানের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে আমর ইবনুল আস সীমিত বাহিনী নিয়ে মিশরের দিকে অগ্রসর হন। প্রাথমিকভাবে তাঁর বাহিনী সংখ্যায় ছোট ছিল, কিন্তু কৌশলগতভাবে সংগঠিত।
তিনি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে ফারামা, বিলবাইস এবং বাবিলিয়নের দুর্গ দখল করেন। বাবিলিয়ন দুর্গের পতন ছিল মিশর বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মিশর অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ছিল আলেকজান্দ্রিয়া দখল। শহরটি ছিল সুদৃঢ় প্রাচীরবেষ্টিত এবং নৌবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত। দীর্ঘ অবরোধ ও সামরিক চাপের পর ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে শহরটি মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
আলেকজান্দ্রিয়ার পতনের মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য মিশরের ওপর কার্যত কর্তৃত্ব হারায়। এটি শুধু একটি শহর দখল নয়; বরং ভূমধ্যসাগরীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
আমর ইবনুল আসের শাসনের বিশেষত্ব ছিল তাঁর বাস্তববাদী প্রশাসনিক নীতি। বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধমূলক বা ধ্বংসাত্মক নীতি গ্রহণ করেননি; বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেন।
তিনি জিজিয়া ও খরাজ করব্যবস্থা সংগঠিত করেন। কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো বহাল রাখা হয়। এর ফলে কৃষি ও বাণিজ্য দ্রুত পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
আলেকজান্দ্রিয়াকে রাজধানী না করে তিনি নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ফুস্তাত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তীকালে কায়রোর ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফুস্তাত ছিল সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র, যা বাইজেন্টাইন প্রভাব থেকে আলাদা একটি নতুন শাসন কাঠামো গড়ে তোলে।
মিশর বিজয়ের পর কপটিক খ্রিস্টান জনগণকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তাদের চার্চ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বহাল থাকে। বাইজেন্টাইন আমলের তুলনায় স্থানীয় চার্চ অনেক ক্ষেত্রে বেশি স্বায়ত্তশাসন লাভ করে।
এই সহনশীল নীতির ফলে মুসলিম শাসন দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমর ইবনুল আস ছিলেন ধৈর্যশীল ও হিসাবি কৌশলবিদ। তিনি সরাসরি বৃহৎ সংঘর্ষে না গিয়ে ধাপে ধাপে দুর্গ দখল ও সরবরাহপথ নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করেন।
তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল—
সীমিত বাহিনী দিয়ে কৌশলগত সাফল্য অর্জন
দীর্ঘমেয়াদি অবরোধে ধৈর্য
প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সামরিক অভিযানের সমন্বয়
মিশর বিজয়ের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী—
মুসলিম শাসনের অধীনে মিশর দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হয়
নীলনদের শস্য উৎপাদন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি শক্তিশালী করে
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়
পরবর্তী শতাব্দীতে মিশর ইসলামী সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
আমর ইবনুল আসের জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—
সামরিক বিজয়ের চেয়েও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ
ধর্মীয় সহনশীলতা রাজনৈতিক স্থায়িত্ব আনে
ধৈর্য ও পরিকল্পনা বৃহৎ শক্তিকেও পরাজিত করতে পারে
অর্থনৈতিক কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রাখা দীর্ঘমেয়াদি শাসনের চাবিকাঠি
আমর ইবনুল আসের মিশর বিজয় ছিল ইসলামী ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আলেকজান্দ্রিয়া দখল তাঁর সামরিক প্রতিভার পরিচয় বহন করে, আর প্রশাসনিক নীতি তাঁর রাষ্ট্রগঠনের দক্ষতার সাক্ষ্য দেয়।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন—যুদ্ধ জেতা এক বিষয়, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীল শাসন গড়ে তোলা আরও বড় কৃতিত্ব।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন