ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে মুহাম্মদ ঘুরি একটি সন্ধিক্ষণ-সৃষ্টিকারী নাম। তাঁর অভিযান কেবল সীমান্ত লুণ্ঠন বা সাময়িক সামরিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং উত্তর ভারতে স্থায়ী মুসলিম রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের সূচনা তাঁর হাতেই। বিশেষত তরাইন যুদ্ধসমূহ উপমহাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য স্থায়ীভাবে বদলে দেয় এবং দিল্লি সালতানতের উত্থানের পথ সুগম করে।
মুহাম্মদ ঘুরি (পূর্ণ নাম: শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘোরি) জন্মগ্রহণ করেন দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে গুর (বর্তমান আফগানিস্তান) অঞ্চলে। তিনি ঘুরি রাজবংশের সদস্য ছিলেন। তাঁর ভাই "গিয়াসউদ্দিন মুহাম্মাদ" ঘুরি সাম্রাজ্যের প্রধান শাসক ছিলেন, আর মুহাম্মদ ঘুরি সামরিক সম্প্রসারণের দায়িত্ব পালন করতেন।
গজনভিদের পতনের পর ঘুরি সালতানাতের শক্তি উত্থিত হয়, এবং মুহাম্মদ ঘুরি পূর্বদিকে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেন।
তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরি মুখোমুখি হন রাজপুত শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহান-এর সঙ্গে। এই যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন এবং পিছু হটতে বাধ্য হন।
পরবর্তী বছরে তিনি নতুন প্রস্তুতি ও কৌশল নিয়ে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় তরাইন যুদ্ধে তাঁর বাহিনী বিজয়ী হয়। পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয় উত্তর ভারতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।
এই বিজয় ছিল দিল্লি ও আজমীর অঞ্চলে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপনের সূচনা।
তরাইনের পর তিনি কানৌজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দখল করেন। ধাপে ধাপে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তিত হয়।
মুহাম্মদ ঘুরির সামরিক কৌশলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—
দ্রুতগামী অশ্বারোহী তুর্কি বাহিনী
ধনুকধারী অশ্বারোহী (horse archers) ব্যবহার
ভান করে পশ্চাদপসরণ (feigned retreat) কৌশল
শত্রুর ভারী অশ্বারোহী ও হাতির বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা
তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তিনি রাতের আক্রমণ ও কৌশলগত বিভাজনের মাধ্যমে রাজপুত বাহিনীকে দুর্বল করেন।
মুহাম্মদ ঘুরি নিজে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। তিনি বিশ্বস্ত দাস-সেনাপতিদের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর সেনাপতি
যিনি পরে দিল্লি সালতানতের প্রতিষ্ঠাতা হন।
সামরিক গভর্নর নিয়োগ
করব্যবস্থা সংগঠিত করা
দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন
স্থানীয় শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা
এই প্রশাসনিক কাঠামোই পরবর্তীকালে দিল্লি সালতানতের ভিত্তি হয়।
এছাড়াও তার সেনাপতিরা -
নাসিরউদ্দিন কাবাচা ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে মুলতানের শাসক হন।
তাজউদ্দিন ইলদিজ গজনির শাসক হন।
অঞ্চলভিত্তিক শাসন
আনুগত্যের বিনিময়ে স্থানীয় রাজাদের বহাল রাখা
সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা
বাণিজ্যপথ সুরক্ষা
তাঁর নীতিতে সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সমন্বয় দেখা যায়।
মুহাম্মদ ঘুরিকে ঘিরে কয়েকটি বিতর্ক রয়েছে—
মন্দির ধ্বংসের প্রশ্ন
ধর্মীয় উদ্দেশ্য বনাম রাজনৈতিক সম্প্রসারণ
তরাইন-পরবর্তী কঠোরতা
আধুনিক ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, তাঁর অভিযান ছিল মূলত রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্য বিস্তারের কৌশল। ধর্মীয় দিকটি ছিল রাজনৈতিক বৈধতার অংশ।
তাঁর বিজয়ের মাধ্যমে—
উত্তর ভারতে মুসলিম রাজনৈতিক শাসনের স্থায়ী ভিত্তি স্থাপিত হয়
দিল্লি কেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে
পারস্য-তুর্কি সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার লাভ করে
স্থাপত্য ও প্রশাসনিক ধারায় নতুন ধারা সৃষ্টি হয়
দিল্লি পরবর্তী কয়েক শতাব্দী উপমহাদেশের রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তরাইন দ্বিতীয় যুদ্ধকে ভারতীয় ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। গুরিদ বিজয় ছাড়া দিল্লি সালতানতের উত্থান সম্ভব হতো না।
মুহাম্মদ ঘুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেয়ে ভিত্তি নির্মাণে বেশি সফল ছিলেন।
তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত। ধারণা করা হয়, তাঁর সরাসরি কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন না। এ কারণেই তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য দ্রুত বিভক্ত হয়ে যায়।
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাব অঞ্চলে তিনি নিহত হন বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে। ঘুর ফেরার পথে তাঁকে হত্যা করা হয়—সম্ভবত স্থানীয় প্রতিপক্ষ বা বিদ্রোহীদের দ্বারা।
তাঁর মৃত্যুর পর গুরিদ সাম্রাজ্য দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে ভারতে তাঁর নিযুক্ত গভর্নর কুতুবউদ্দিন আইবেক স্বাধীনভাবে শাসন শুরু করেন এবং দিল্লি সালতানতের ভিত্তি স্থাপন করেন।
অতএব, মুহাম্মদ ঘুরির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো—দিল্লি সালতানতের জন্ম।
মুহাম্মদ ঘুরির জীবন থেকে পাওয়া যায়—
পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়া
কৌশলগত অভিযোজনের গুরুত্ব
সামরিক সাফল্যের পর প্রশাসনিক ভিত্তি নির্মাণ অপরিহার্য
বিশ্বস্ত অধীনস্থ তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের চাবিকাঠি
মুহাম্মদ ঘুরি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি তরাইন দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী পরিবর্তন আনেন। তিনি নিজে হয়তো দিল্লির সিংহাসনে বসেননি, কিন্তু তাঁর হাতে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোই পরবর্তী মুসলিম শাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে—ইতিহাসে কখনো কখনো বিজয়ী নয়, ভিত্তি নির্মাতারাই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যান।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন