সাধারণ থেকে সম্রাটে উত্তরণ: একটি রাষ্ট্র গঠনের মহাকাব্যিক উপাখ্যান
শের শাহ সূরি কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তাঁর আসল নাম ফরিদ খান। ১৪৮৬ সালে বিহারের সাসারামে এক আফগান পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর শাসনকাল মাত্র পাঁচ বছরের (১৫৪০–১৫৪৫), কিন্তু এই স্বল্প সময়ে তিনি যা অর্জন করেছেন, তা অনেক রাজবংশ শত বছরেও পারেনি।
ফরিদের শৈশব খুব একটা সুখকর ছিল না। সৎ মায়ের সাথে বিবাদের কারণে তিনি ঘর ছাড়েন এবং জৌনপুরে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
বীরত্বের পরিচয়: বিহারের তৎকালীন গভর্নর বাহার খান লোহানির অধীনে কর্মরত অবস্থায় তিনি খালি হাতে একটি বাঘ হত্যা করেন। এই অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে 'শের খান' উপাধি দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক উত্থান: মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীতে কিছুকাল চাকরি করার সময় তিনি মুঘলদের যুদ্ধকৌশল খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যা পরে হুমায়ুনকে পরাজিত করতে কাজে লাগে।
শের শাহের সামরিক রণকৌশল ছিল মূলত 'মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ' এবং **'গতিশীলতা'**র সংমিশ্রণ।
চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯): গঙ্গার তীরে কৌশলগত অবস্থানে মুঘল বাহিনীকে আটকে দিয়ে তিনি হুমায়ুনকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।
কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০): এই যুদ্ধের মাধ্যমেই তিনি মুঘলদের ভারত থেকে বিতাড়িত করেন এবং দিল্লিতে 'দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য' বা সূর বংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
সামরিক উদ্ভাবন: তিনি সুলতানি আমলের 'দাগ' (ঘোড়া চিহ্নিত করা) এবং 'হুলিয়া' (সৈনিকদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করা) প্রথাকে কঠোরভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন যাতে সেনাবাহিনীতে দুর্নীতি না হয়।
শের শাহের প্রশাসনিক দর্শন ছিল— "প্রজা সুখী হলে সম্রাট নিরাপদ।" তাঁর সংস্কারগুলো পরবর্তীকালে আকবর ও ব্রিটিশরা হুবহু অনুসরণ করেছিল।
তিনি ১৭৮ গ্রেন ওজনের খাঁটি রুপার মুদ্রা চালু করেন, যার নাম দেন 'রুপিয়া'। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মুদ্রার নাম যে 'রুপি', তার আদি উৎস শের শাহ। তিনি সোনা, রুপা ও তামার মুদ্রার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেন।
তিনি বাণিজ্যের প্রসারে চারটি প্রধান জাতীয় সড়ক নির্মাণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (G.T. Road), যা সোনারগাঁও (বাংলাদেশ) থেকে সিন্ধু নদ (পাকিস্তান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
রাস্তার দুপাশে ফলের গাছ লাগানো এবং প্রতি ২ ক্রোশ (প্রায় ৮ কিমি) অন্তর মোট ১,৭০০টি সরাইখানা নির্মাণ করেন।
এই সরাইখানাগুলো পরবর্তীতে ডাক ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তিনি প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জমি জরিপ করেন। ফসলের এক-তৃতীয়াংশ কর হিসেবে নির্ধারিত হয়।
বিচারের কঠোরতা: শের শাহ বিশ্বাস করতেন, "ন্যায়বিচার হলো ধর্মের শ্রেষ্ঠ কাজ।" তিনি ঘোষণা করেছিলেন, চুরির জন্য স্থানীয় গ্রাম প্রধান দায়ী থাকবেন, ফলে অপরাধের হার শূন্যে নেমে এসেছিল।
শের শাহের পারিবারিক জীবন ছিল রাজনৈতিক ব্যস্ততায় ঘেরা।
বিবাহ: তিনি রাজনৈতিক মিত্রতা স্থাপনের জন্য বিভিন্ন প্রভাবশালী পরিবারের কন্যাদের বিয়ে করেন। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনই ইতিহাসে বেশি উজ্জ্বল।
মৃত্যু (১৫৪৫): মধ্য ভারতের কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধের সময় একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্গের দেয়াল ভাঙার জন্য ছোড়া একটি কামানের গোলা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে বারুদের স্তূপে পড়ে। ভয়াবহ বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ১৫৪৫ সালের ২২ মে এই মহান বীর মৃত্যুবরণ করেন।
উত্তরাধিকার: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ইসলাম শাহ সূরি সিংহাসনে বসেন। তিনি আট বছর যোগ্যতার সাথে শাসন করলেও তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারীরা ছিলেন অযোগ্য ও বিলাসপ্রিয়। ফলে ১৫৫৫ সালে হুমায়ুন পুনরায় ভারত দখল করে নেন।
ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে যে, তিনি কি কেবল একজন 'দখলদার' ছিলেন? আধুনিক পুনর্মূল্যায়ন বলছে— না।
ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব: তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন ব্রহ্মজিৎ গৌড় (হিন্দু)। তিনি ধর্মকে রাজনীতির উর্ধ্বে রেখে মেধার মূল্যায়ন করতেন।
সভ্যতাগত প্রভাব: তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় বড় অট্টালিকা বানানোর চেয়ে রাস্তা ও মুদ্রাব্যবস্থা সংস্কার করা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য বেশি জরুরি।
শের শাহ সূরির সমাধিটি বিহারের সাসারামে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই বিশাল ও শান্ত।
মুঘলদের শিক্ষক: সম্রাট আকবর যে 'মনসবদারি' ও 'জবতি' প্রথা চালু করেছিলেন, তার মূল নীল নকশাটি তৈরি করেছিলেন শের শাহ।
ভারতের সংহতি: উত্তর ভারতকে একটি অখণ্ড প্রশাসনিক সুতোয় বাঁধার প্রথম সার্থক চেষ্টা তিনি করেছিলেন।
উপসংহার: শের শাহ সূরি ছিলেন একজন স্বনির্মিত মানুষ (Self-made man)। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং জনহিতকর কাজ করলে মৃত্যুর শত বছর পরেও মানুষের হৃদয়ে ও রাষ্ট্রের কাঠামোতে বেঁচে থাকা সম্ভব।

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন