পাবনার ঈশ্বরদীতে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোড়ন ছড়িয়েছে গোটা অঞ্চলে। দাদি ও নাতনিকে হত্যার পর ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত এক স্বজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার সকালে নিজ বাড়ির উঠান থেকে দাদির এবং পাশের সরিষাক্ষেত থেকে নাতনির লাশ উদ্ধারের পর রোববার এই গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে।
পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ রোববার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে। বাড়িটির গত সাত দিনের কার্যক্রম ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে একজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে আটক করে।
গ্রেফতার হওয়া ওই যুবকের বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। তিনি নিহত পরিবারের একজন স্বজন। পুলিশ সুপার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বাঁশের গুঁড়ি, কাঠের বাটাম ও হাতুড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, নিহত কিশোরীর বাবা কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকেন। বাড়িতে শুধু দাদি (৬৫) ও নাতনি (১৫) ছিলেন। ওই যুবক মাঝেমধ্যেই তাদের বাড়িতে যেতেন এবং বাজারসহ বিভিন্ন কাজ করে দিতেন। একপর্যায়ে তিনি কিশোরীকে কুপ্রস্তাব দিতে থাকেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি কিশোরীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করলে মেয়েটি তাঁকে চড় মারেন। পরে তিনি সেখান থেকে চলে যান।
ঘটনার দিন শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ওই যুবক আবার বাড়িতে আসেন এবং কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করতে থাকেন। এ সময় দাদি বাধা দিলে এবং চিৎকার শুরু করলে যুবক পাশে রাখা কাঠের বাটাম দিয়ে নারীর মাথায় আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর তিনি ঘরের ভেতরে ঢুকে কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। মেয়েটি চিৎকার শুরু করলে যুবক হাতুড়ি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। পরে অচেতন অবস্থায় মেয়েটিকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যান এবং কয়েক দফা পিটিয়ে হত্যার পর ধর্ষণ করেন বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে ওই বাড়ি থেকে হঠাৎ কান্নার শব্দ শোনা গিয়েছিল। এ সময় কয়েকজন প্রতিবেশী ঘর থেকে বের হলেও কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে যাওয়ায় তারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান। শনিবার সকালে প্রতিবেশীরা বাড়ির উঠানে দাদির রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। নাতনিকে ঘরে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হলে পাশের একটি সরিষাক্ষেতে তাঁর লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে থানায় খবর দিলে পুলিশ গিয়ে লাশ দুটি উদ্ধার করে।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান জানান, ময়নাতদন্ত শেষে বেলা পৌনে তিনটার দিকে দাদি-নাতনির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত নারীর মেয়ে বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় গ্রেফতার হওয়া ওই যুবককে আসামি দেখানো হয়েছে।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান জানান, গ্রেফতার হওয়া যুবককে সোমবার আদালতে পাঠানো হবে এবং তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকায়। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন দাদি ও নাতনির এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকাবাসীর মাঝে চলছে ক্ষোভ ও শোকের কান্না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে হত্যাকারীকে গ্রেফতার করলেও এই ঘটনা আবারও নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আমরা এই ঘটনার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের রায় সম্পর্কে নিয়মিত খবর রাখব।

বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন