মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট চতুর্থ দিনে গড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই ইরানে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কমপক্ষে ১৫৩টি শহরে ৫০৪টি স্থানে এক হাজার ৩০৯টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
মঙ্গলবার ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৭৮৭ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হামলায় আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।
আইআরজিসির হুঁশিয়ারি
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা আরো তীব্র হবে। যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইরানের এ বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য আরো অধিক 'জাহান্নামের দরজা' উন্মুক্ত হবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি বলেন, 'শত্রুদের জন্য সামনে আরো ভয়াবহ এবং ক্রমাগত শাস্তিমূলক হামলা অপেক্ষা করছে। শত্রুদের একের পর এক শাস্তিমূলক হামলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর মুহূর্তের মধ্যে জাহান্নামের দরজাগুলো আরও বেশি করে উন্মুক্ত হতে থাকবে।'
সৌদি আরামকো হামলায় ইসরায়েলকে দায়ী করল ইরান
সৌদি তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোতে ড্রোন হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে ইরান। তেহরান একে 'ফলস ফ্ল্যাগ' বা ছদ্মবেশী অভিযান আখ্যা দিয়েছে। এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি লিখেছে, 'আরামকোর ওপর হামলাটি ছিল ইসরায়েলের একটি ছদ্মবেশী অভিযান। ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে যে অপরাধ তারা করছে, তা থেকে আঞ্চলিক দেশগুলোর দৃষ্টি ভিন্নখাতে নেয়াই ইসরায়েলের উদ্দেশ্য।'
ওই সূত্র জানায়, ইরান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে সব মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ ও স্থাপনাকে নিশানা করবে এবং এ পর্যন্ত অনেকগুলোতে হামলাও চালিয়েছে। তবে আরামকোর স্থাপনাগুলো ইরানি হামলার নিশানার মধ্যে ছিল না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে হামলার দাবি ইসরায়েলের
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। ইসরায়েল সামরিক বাহিনী বা আইডিএফ টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে অসংখ্য গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। বার্তায় আরো বলা হয়েছে, ইরানের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির শাসন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা করা হয়েছে।
ইউরোপকে হুঁশিয়ারি ইরানের
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোকে না যোগ দেয়ার বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'এটি যুদ্ধের শামিল হবে। ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের যেকোনও পদক্ষেপকে হামলাকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবেই দেখা হবে।'
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স 'প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা' নিতে পারে বলে জানানোর পর তেহরান এই হুঁশিয়ারি দিল।
রাশিয়ার সতর্কতা
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে। তার মতে, এ ধরনের আক্রমণ শুধু ইরানকেই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোকেও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে ঠেলে দিতে পারে।
লাভরভ আরো বলেন, ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল, এমন কোনো প্রমাণ এখনো মস্কোর হাতে নেই। তিনি বলেন, 'আমরা এখনো এমন কোনো প্রমাণ দেখতে পাচ্ছি না যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল—যা ছিল এ যুদ্ধের অন্যতম ও প্রধান অজুহাত।'
লেবাননে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজার
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছেন। সংস্থাটির মুখপাত্র বাবর বালোচ বলেন, আরো অনেক মানুষ রাস্তার পাশে তাদের গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন অথবা এখনো রাস্তায় যানজটে আটকে আছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। চতুর্থ দিনে গড়িয়ে যাওয়া এই যুদ্ধে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। ইরানের জাহান্নামের দরজা উন্মুক্ত হওয়ার হুঁশিয়ারি, ইউরোপকে যুদ্ধে না জড়ানোর সতর্কতা এবং রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আমরা এই ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিয়মিত খবর রাখছি।
বিষয় : ইরান

বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন