ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সকল রাজনৈতিক দলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে দেওয়া ভাষণে তিনি জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নে সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন,
“জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা জাতির কাছে দায়বদ্ধ। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়—এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।”
ভাষণে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে একপর্যায়ে এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, ওই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং নারী-পুরুষ-শিশুসহ অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গু হয়েছেন।
ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করেন। পাশাপাশি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-কে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার আমলে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা এবং স্নাতক (পাস) স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নবগঠিত সরকারের সামনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
চরমপন্থা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আইনগত ব্যবস্থা ছাড়াও সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক কৌশলের মাধ্যমে এসব হুমকি মোকাবিলা করা হবে।
বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলার জট কমানো, বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি দূর করা, বিচারিক পরিষেবা আধুনিকীকরণ এবং বিচার বিভাগীয় কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯ শতাংশ, আর মাথাপিছু জাতীয় আয় পৌঁছেছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলারে।
অর্থনীতির কয়েকটি সূচক তুলে ধরে তিনি জানান—
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি: ৪৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
মোট রপ্তানি: ৮.৬০% বেড়ে ৪৮.৩০ বিলিয়ন ডলার
রেমিট্যান্স প্রবাহ: ২৬.৮৩% বেড়ে ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: ৩৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার
মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৫ সালের জানুয়ারির ৯.৯৪% থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮.৫৮%
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের কথা জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধান এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নতুন বাস্তবতায় সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অভিবাসন কূটনীতিতে জোর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালসহ সকল সংসদ সদস্যকে অভিনন্দন জানান।

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন