চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে নির্বিচারে পাহাড় কাটার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কোটি টাকার স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণ কাজ চলাকালে প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে ট্রাকে ট্রাকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের পর দিন এই ধ্বংসযজ্ঞ চললেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নীরব প্রশ্রয় দিচ্ছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী।
পরিবেশবিধি লঙ্ঘন করে পাহাড় নিধনের এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং সরকারি প্রকল্পেই ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে আনা মাটি। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মাজেদ এন্টারপ্রাইজ’ কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনাইছড়ি এলাকার পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে ট্রাক করে মাটি সরকারি প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। দিনের পর দিন এই কার্যক্রম চললেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় সাতকানিয়ার সোনাইছড়ি উপ-প্রকল্পে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণ কাজ’ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাজেদ এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য এক কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ টাকা।
সোনাইছড়ি এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরেই পাহাড় কাটার কার্যক্রম চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘এটা কোনো গোপন বিষয় না। সবাই দেখছে রাতভর স্কেভেটর চলে। সরকারি কাজের জন্যই এই মাটি নেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রকৌশলীরা কিছু জানেন না—এটা বিশ্বাসযোগ্য না।’
আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকার পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে এত অভিযান চালায়। কিন্তু সরকারি প্রকল্পেই যদি পাহাড়ের মাটি ব্যবহার হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কী বার্তা পাবে?’
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় কাটার ফলে ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে মাটি ধসের ঘটনা ঘটেছে। বর্ষা শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস-এর সাবেক অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘রক্ষক যদি ভক্ষক হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়। পাহাড় কাটা হলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।’
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে ঠিকাদারের লোকজনকে বকাবকি করেছেন বলে জানান।
এলজিইডির সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘ঠিকাদার পার্শ্ববর্তী জমি থেকে মাটি নিতে পারবেন, তবে পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।’
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘সরকারি বা বেসরকারি—কোনো প্রকল্পেই পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা যাবে না। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি জানার পর আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’
ইউএনও নিশ্চিত করেন যে, এ ঘটনায় পাহাড় কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন