নেত্রকোনার মদনে এক মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণ ও অন্তঃসত্ত্বা করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আক্তারুজ্জামান গত ১৬ মে ঢাকায় ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) কার্যালয়ে গিয়ে ১৭ মে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আসামির নমুনা জমা দেন। বর্তমানে অভিযুক্ত শিক্ষক জেল হাজতে রয়েছেন।
ডিএনএ সংগ্রহ ও আদালতের নির্দেশ
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনা আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ রিয়াদ মাহমুদ। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আসামির ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৮ জুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আক্তারুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসামিকে ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিবরণ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের এক মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর ওই শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে শিশুটি মাদরাসায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়। সম্প্রতি শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ঘটলে তার মা সিলেট থেকে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তাকে মদন উপজেলা হাসপাতাল রোডের স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারের চেম্বারে নিয়ে গেলে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
মামলা ও গ্রেপ্তার
এই ঘটনায় গত ২৩ এপ্রিল মেয়েটির মা বাদী হয়ে মদন থানায় আমান উল্লাহ সাগর ও তার ভাইকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরে সাগরের ভাই আদালত থেকে জামিন নেন। মামলা দায়েরের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করে র্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ মে ভোর ৪টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে র্যাব-১৪-এর একটি অভিযানিক দল অভিযুক্ত আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করে। ওই দিন সন্ধ্যায়ই তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে নেত্রকোনার অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহসিনা ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়।
রিমান্ড ও ডিএনএ নির্দেশ
তিন দিনের রিমান্ড শেষে গত ১০ মে বিকেলে আসামিকে পুনরায় আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধ প্রমাণের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তা আসামির ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই গত ১৭ মে ঢাকার সিআইডি কার্যালয়ে আসামির ডিএনএ স্যাম্পল জমা দেওয়া হয়।
শিশুর বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে ১২ বছর বয়সী ওই শিশুটি ২৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার মা আদালতের কাছে সুরক্ষার আবেদন জানান। মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ মে বিকেলে বিচারকের নির্দেশে শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সিলেটের একটি নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ হোম) পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সে সেখানেই চিকিৎসাধীন ও নিরাপদ হেফাজতে রয়েছে।
নেত্রকোনার এই ধর্ষণ মামলা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করে অন্তঃসত্ত্বা করার ঘটনা মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন এলে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে। শিশুটিকে সেফ হোমে পাঠানো হলেও, তার মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজন। দ্রুত বিচার ও অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন