ভারত স্বাধীন হওয়ার অনেক আগের কথা। এক সিংহপুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন ইংরেজ আদালতে। নাম তাঁর সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি। মামলা চলছে তাঁর বিরুদ্ধে। আদালত চত্বরে অসংখ্য লোক। সবাইকে থ করে দিয়ে ওই ব্যক্তির কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল সিংহনাদ—"ইংরেজের সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেওয়া মুসলমানদের জন্য হারাম।" জোর দিয়ে তিনি তিনবার এই বাক্য ঘোষণা করলেন।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মাওলানা হাত জোড় করে বললেন, "মহাশয়, আপনার উক্তি উঠিয়ে নিন, আপনি কী বললেন?" কিন্তু মাদানির কথা তো ধনুক থেকে বেরোনো তীরের মতো। যা বলেছেন, তা তো হবেই। কোনো অবস্থায় নড়চড় হবে না।
ইংরেজ অফিসাররা প্রচণ্ড রেগে ওঠে। প্রধান অফিসার বললেন, "হোসাইন আহমদ, তুমি কি জানো, এই ঔদ্ধত্যের শাস্তি কী হতে পারে?" মাদানি জবাব দিলেন, "তোমরাই ঠিক করে নাও।" অফিসার বললেন, "এই অপরাধের কমসে কম শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।"
মাদানি নিজের কাঁধে থাকা সাদা চাদর দেখিয়ে বললেন, "হোসাইন আহমদ মাদানি যখন দেওবন্দ থেকে রওয়ানা হয়েছে, তখন মৃত্যু পরবর্তী শেষকৃত্যের জন্য কাফন নিয়েই বেরিয়েছে। হোসাইন এসব ধমকিতে ভয় করে না। আমি যা বলেছি, আবার বলছি—তোমাদের সেনায় যোগ দেওয়া আমাদের জন্য হারাম।"
ইতিহাসের সেই ঘটনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা এমনিতেই আসেনি। এর পেছনে আছে রক্ত, ঘাম আর অসীম সাহস। সেই বীরদের একজন হলেন হুসাইন আহমদ মাদানি। যাঁকে পরবর্তীকালে ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
হুসাইন আহমদ মাদানি ১৮৭৯ সালের ৬ অক্টোবর (১২৯৬ হিজরির ১৯ শাওয়াল) ভারতের উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার বাঙ্গারমৌ মৌজায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ হাবিবুল্লাহ এবং মাতার নাম নুরুন্নিসা। বংশগতভাবে পিতা ও মাতা উভয়ের দিক থেকেই তিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদ (স.)-এর বংশধর। হোসাইন ইবনে আলী ছিলেন তাঁর ৩৩তম পূর্বপুরুষ।
ছোটবেলায় মায়ের কাছে কুরআনের প্রথম পাঁচ পারা পড়েন। পরে পিতার কাছে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু স্কুলের পড়াশোনা তাঁর পছন্দ ছিল না। তাই ১৮৯২ সালে তাকে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি করে দেওয়া হয়।
দেওবন্দে ভর্তির সময় প্রধান অধ্যাপক ছিলেন মাহমুদ হাসান দেওবন্দি। তিনিই মাদানির শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে দেন। মাদানি সাড়ে ছয় বছরে ১৭টি বিষয়ের ৬৭টি কিতাব অধ্যয়ন করেন। এর মধ্যে ২৪টি কিতাব এককভাবে দেওবন্দির কাছে পড়েন।
শিক্ষাজীবনে তিনি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। পরে হাদিস ও আরবি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হন। ১৮৯৮ সালে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।
শিক্ষা শেষে পিতামাতার সঙ্গে তিনি মদিনা চলে যান। সেখানে গিয়ে মসজিদে নববীতে বিনা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য ছোট একটি দোকানও খোলেন। কিন্তু বেশি দিন টিকল না। পরে খেজুরের ব্যবসা ও গ্রন্থ নকলের কাজ করেন।
মদিনায় তাঁর খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ‘শায়খুল হারাম’ নামে পরিচিত হন। মসজিদে নববীতে তাঁর ক্লাসে উপস্থিত থাকতেন মদিনার ওলামা, কাজী, মুফতি এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও। তিনি মালিকি ও শাফিঈ ফিকহের কিতাবগুলোও আয়ত্ত করেন, কারণ মদিনায় এগুলোর প্রচলন ছিল।
১৮৯৮ সালে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির কাছে তিনি বায়আত গ্রহণ করেন। গাঙ্গুহির নির্দেশে পরবর্তীতে ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির কাছে তাসাউফের শিক্ষা নেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে গাঙ্গুহি তাকে খেলাফত দান করেন।
মাদানি চারটি তরিকার ইজাযতপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকায় দীক্ষা দিতেন। তাঁর কাছে লক্ষাধিক মুরিদ ছিল, যার মধ্যে ১৬৭ জনকে তিনি নিজের খলিফা মনোনীত করেছিলেন।
তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট—তিনি শিরক ও বিদআতের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আহমদ রেজা খান যখন আরব দেশে গিয়ে বিদআতের সমর্থনে ফতোয়া সংগ্রহ করতে চান, মাদানি তাকে মদিনা থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করেন।
১৯১৫ সালে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মদিনায় এলে মাদানি তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৬ সালে মক্কার বিদ্রোহী গভর্নর শরিফ হুসাইনের নির্দেশে মাদানি ও দেওবন্দিকে গ্রেফতার করে মাল্টায় নির্বাসিত করা হয়। মাদানি স্বেচ্ছায় দেওবন্দির সঙ্গে কারাবরণ করেন।
মাল্টায় প্রায় ৪ বছর বন্দি থাকার সময় তিনি কুরআন হেফজ সম্পন্ন করেন। এখানে তিনি তুর্কি ভাষাও আয়ত্ত করেন। জেলের ভেতর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকলেও তিনি ইসলামি বিধান নিয়ে আপস করেননি। জেল কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে মুসলিম কয়েদিদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
১৯২০ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। মদিনায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও মাহমুদ হাসান দেওবন্দি তাকে ভারতে থাকার পরামর্শ দেন। দেওবন্দির মৃত্যুর পর তিনি ‘জানাশীনে শায়খুল হিন্দ’ উপাধি লাভ করেন।
তিনি কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২১ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত খেলাফত সম্মেলনে তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীতে চাকরি করা হারাম ঘোষণা করেন। এই ফতোয়া মুদ্রিত হয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলে তাকে ২ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯২৩ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি সিলেটে আসেন। এখানকার ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্থানীয়দের অনুরোধে তিনি তিন বছর সিলেটে অবস্থান করেন এবং সিহাহ সিত্তাহর পাঠদান শুরু করেন।
সিলেটেই তিনি তাসাউফের বেশিরভাগ কাজ সম্পাদন করেন। প্রতি রমজানে সিলেটে এসে ইতিকাফ করতেন। তাঁর উদ্যোগে সিলেট ও আসাম অঞ্চলে অসংখ্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও সে অঞ্চলে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯২৮ সালে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান অধ্যাপক (সদরুল মুদাররিস) পদে যোগ দেন। এখানে ৩১ বছর তিনি হাদিসের অধ্যাপনা করেন। তাঁর অধ্যাপনায় দারুল উলুমের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকেও ছাত্ররা আসতেন।
তিনি পাঠ্যক্রম সংস্কার করেন। তাফসিরের কিতাব, ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রদর্শন এবং এমনকি ইংরেজি ভাষার অধ্যয়ন চালু করেন। শরীরচর্চার জন্যও বিভাগ খোলেন। ছাত্রদের কেরাআত শিক্ষার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেন।
১৯৩৮ সালে এক ভাষণে মাদানি বলেন, বর্তমানে জাতীয়তা নির্ধারিত হয় ভূখণ্ডের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। সংবাদপত্রে এটি বিকৃতভাবে ছাপা হলে কবি মুহাম্মদ ইকবাল মাদানিকে বিদ্রুপ করে একটি কবিতা লেখেন। এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর আগে ইকবাল মাদানির কাছে ক্ষমা চেয়ে পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
মাদানি দ্বিজাতি তত্ত্ব ও ভারত বিভক্তির বিরোধী ছিলেন। তিনি ‘সম্মিলিত জাতীয়তাবাদ’ ও ‘মাদানি ফর্মুলা’ উপস্থাপন করেন, যেখানে সুবাগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারত বিভক্ত হয়।
বিভক্তির পর তিনি ভারতে থাকা মুসলমানদের অভিভাবকের দায়িত্ব নেন। তাদের ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেন এবং সরকারের কাছে তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করেন। তিনি দখল হওয়া মসজিদ, মাদ্রাসা ও সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
মাদানি একজন লেখক হিসেবেও সমাদৃত। তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে:
নকশে হায়াত (আত্মজীবনী)
মুত্তাহিদায়ে কাওমিয়াত আওর ইসলাম (সম্মিলিত জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম)
আশ শিহাবুস সাকিব (বেরলভি মতবাদের সমালোচনা)
এছাড়া তাঁর অসংখ্য চিঠি ও বক্তৃতা ‘মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৫৫ সালে তিনি শেষ হজ সম্পন্ন করেন। ১৯৫৭ সালের ৫ ডিসেম্বর দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার জানাজা সম্পন্ন করে। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও এতে অংশ নেন।
তাকে মাজারে কাসেমিতে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির পাশে সমাহিত করা হয়।
১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০১২ সালে ভারতীয় ডাক বিভাগ তার সম্মানে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। সিলেটে তার স্মৃতি বিজড়িত স্থানে নির্মিত হয়েছে ‘মাদানি চত্বর’। দেওবন্দে তার নামে সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
হুসাইন আহমদ মাদানি শুধু একজন ইসলামি পণ্ডিত ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিক্ষাবিদ, সুফি, লেখক ও অকুতোভয় নেতা। ইংরেজ আদালতে কাফন কাঁধে নিয়ে তিনি দেখিয়ে গেছেন— সত্যের পথে কথা বলার জন্য মৃত্যুও বড় বাধা নয়। আজকের প্রজন্ম যদি ইতিহাসের লুক্কায়িত পাতা থেকে তাঁদের বীরত্বের গল্প জানে, তাহলে সেই রক্ত শিরায় শিরায় বইবে আর দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হবে।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন