বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে পুরুষ না থাকা বাসা-বাড়ি টার্গেট করা হতো। এরপর গভীর রাতে দেয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করে যে কোনো ভারী বস্তু দিয়ে মহিলাদের মাথায় আঘাত করা হতো। এরপর চুরি করা হতো। রক্তপাতের ভয়ে একটিই আঘাত করা হতো। তারপরও হতাহতের ঘটনা ঘটতো। সিরিয়াল কিলার গোলাম মোরশেদের বরাত দিয়ে গায়ের লোম শিহরিত হওয়ার মতো এসব অবস্থার কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় জেলা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এর আগে বুধবার ভোরে গাজীপুর জেলার শরিফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোলাম মোরশেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর থানার পাতহাট গ্রামের হইবর রহমানের ছেলে।
পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানান, গত ৬ মাসে নওগাঁর ধামইরহাট, বদলগাছী ও পত্নীতলা থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতে বাড়িতে ঢুকে নারীদের ওপর হামলা করে জিনিসপত্র চুরি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
গত ১৮ জানুয়ারি রাতে ধামইরহাট থানার নানাইচ গ্রামে গভীর রাতে দেয়াল টপকে হাসান আলীর বাড়িতে প্রবেশ করে গোলাম মোরশেদ। এরপর তার মেয়ে কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার ঘরে ঢুকে মাথায় টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আঘাতের ফলে উম্মে হাবিবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একই দিনে ওই অপরাধী আরও দুই পৃথক বাড়িতে প্রবেশ করে ভিকটিমদের মাথায় মারাত্মক আঘাত করে পালিয়ে যায়।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় একই থানার জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের ঘরে প্রবেশ করে তার স্ত্রী সুলতানা বেগমকে মাথায় বাঁশ দিয়ে গুরুতর আঘাত করে। এরপর এলাকায় একই রাতে আরও তিন বাড়িতে প্রবেশ করে ভিকটিমদের টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল দিয়ে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যায়। সিরিয়ালভাবে এসব ঘটনা ঘটায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গত ৭ মে বদলগাছী থানার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় রাতে দেয়াল টপকে তিন বাড়িতে প্রবেশ করে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাক প্রতিবন্ধি বৃষ্টিকে (২০) মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়।
সবশেষ ৪ জুন পত্নীতলা থানার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে গভীর রাতে দেয়াল টপকে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে রোজি আক্তারকে (৩৭) এবং অপর একটি বাড়ির জানালা ভেঙে আলতা বানু (৪৫) ও তার মেয়ে আসমা খাতুনকে (২২) লোহার শাবল দিয়ে মাথায় আঘাত করে। এ বিষয়ে জেলার বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, জেলার তিনটি থানায় অন্তত ১২টি এমন ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশ প্রশাসন মাঠে নামে। কিন্তু পুলিশের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে জেলা পুলিশের বিশেষ টিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বিষয়টি সনাক্ত করে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, “গোলাম মোরশেদ পেশাদার সাইকো সিরিয়াল কিলার। সে একাই এসব অপরাধ করে এবং বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়ায়। এ কারণে তথ্য উদঘাটন করা কঠিন ছিল।” পরে গাজীপুর জেলার শরিফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে সে।
মামলাটি তদন্তকালে জানা যায় যে, দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন থানায় অনুরূপ ৫টি ঘটনা ঘটেছে এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের ঘটনায় একজন নারী মারা গেছে। জয়পুরহাট জেলায় অনুরূপ একটি ঘটনায় দুইজন নারী গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং একজন নারী মারা যান।
গোলাম মোরশেদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী:
পুরুষ সদস্য নেই—এমন বাড়ি টার্গেট করত সে
গভীর রাতে নির্জনতা দেখে দেয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করত
একটিমাত্র আঘাতে কাজ সেরে নিত—যাতে রক্তপাতের শব্দ বা জটিলতা না হয়
হামলা চালানোর পর বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করত
রক্তপাতের ভয়ে একটিই আঘাত করলেও বেশিরভাগ ঘটনায় ভিকটিমের মৃত্যু বা জখম হয়েছে
বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশের বিশেষ টিমের অভিযানে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে এই সিরিয়াল কিলার। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিচার শুরু হবে। পুলিশ মনে করছে, সে আরও কোথাও অপরাধ করে থাকতে পারে। সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন