দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কেবল নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না।
শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ডি-রেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা জরুরি। এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। এতে অর্থনীতি আবারও ঋণনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই না যে শুধু কাগজে-কলমে বিনিয়োগবান্ধব নীতি থাকবে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি করতে হবে। এটা কোনোমতেই চলবে না।”
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ-সংক্রান্ত নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারকিতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। কোথাও নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
টাস্কফোর্সের কাজ হবে—
নীতিমালা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ শুনানি ও দ্রুত নিষ্পত্তি
নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ
জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
সরকারি সেবা পেতে গিয়ে কেউ হয়রানি বা ক্ষতির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টাস্কফোর্স ব্যবস্থা নেবে। কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে হবে না। অনলাইনে অভিযোগ দিলেই হবে।”
পাশাপাশি প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। কোনো কাজ বিলম্বিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তৃণমূল পর্যায়ের সৃজনশীল পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। উদাহরণ হিসেবে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটির কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব পণ্যের আধুনিক নকশা ও বাজারমূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজাইনিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে।
এ কার্যক্রমে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা করেন, ডিজাইনিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রান্তিক কারিগররা তাদের পণ্যের মান ও নকশা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারবেন।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কার্যালয়ে বিশেষ ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ফলে প্রকল্পে বিলম্ব বা ব্যর্থতার কারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, এই ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে—
প্রকল্পের শতকরা অগ্রগতি দেখা যাবে
বাজেট বাস্তবায়নের হার জানা যাবে
কাজ বিলম্বিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কতা আসবে
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নির্ধারিত থাকবে
বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার শুধু নীতিমালা প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দ্রুত বাস্তবায়নের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে—
নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ
কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও প্রণোদনা প্রদান
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলোর ৮০ শতাংশও যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।
তিনি বলেন, “আমরা একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু আমরা যতটুকু পরিকল্পনা করেছি, সেটার সিংহভাগ বাস্তবায়ন করতে পারলে মানুষ আরও স্বস্তি পাবে। বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আর দেশ এগিয়ে যাবে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে।”
অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আরও জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজের দাম যৌক্তিক রাখতে টিসিবির কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করবে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যানসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন