যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবশেষে হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক চুক্তির ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, এখন থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো শুল্ক ছাড়াই মুক্তভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। রোববার ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী এই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শত্রুতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ২৮ ডিসেম্বর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ছিল।
নিজের ৮০তম জন্মদিনে এই চুক্তির ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে অভিনন্দন! আমি হরমুজ প্রণালি শুল্কমুক্তভাবে খুলে দেওয়ার পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলো। বিশ্বের জাহাজগুলো, আপনাদের ইঞ্জিন চালু করুন। তেল সরবরাহ শুরু হোক!’
আলাদা এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, এই চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার আগে অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আঞ্চলিক নেতারা এই প্রথম এমন একজন প্রেসিডেন্টকে পেয়েছেন যিনি প্রকৃত শান্তি অর্জনে সহায়তা করতে পারেন।’
তবে চুক্তির পর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে সতর্কও করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। অথবা মধ্যপ্রাচ্যের মোট রাজস্বের ২০ শতাংশের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের ‘অভিভাবক’ হতে পারে। তবে চুক্তি ঘোষণার আগে না পরে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের ঘোষণার আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই চুক্তির কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এই চুক্তি হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
শাহবাজ শরীফ এই সফল মধ্যস্থতার জন্য কাতার, সৌদি আরব এবং তুরস্কের নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে এ সপ্তাহে আলোচনার ভিত্তি তৈরি করতে মধ্যস্থতাকারীরা বেশ কয়েকটি বৈঠক করবেন।’
জাতিসংঘ: জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে একে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানকে অভিনন্দন জানান। গুতেরেস সফল মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তান, কাতার, মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্কের গঠনমূলক ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেন।
তুরস্ক: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ‘ব্যতিক্রমী মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার’ বিশেষ প্রশংসা করে তিনি মার্কিন ও ইরানি নেতৃত্বের সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানান। পাশাপাশি, কাতার ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ চুক্তির শর্তগুলো দ্রুত ও পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মিশনের সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালী দ্রুত উন্মুক্ত করা জরুরি।
জার্মানি ও ইতালি: যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির সমন্বয়ে গঠিত ‘ই৪’ (E4) জোট এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান যদি তাদের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ বজায় রাখে, তবে তারা তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে প্রস্তুত। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ বলেন, ‘এই কূটনৈতিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পথ প্রশস্ত করবে।’
কাতার: কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টাই এই সমঝোতা স্মারক অর্জনে মাঠপর্যায়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল।
জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড: জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত হবে এবং ইরানের পরমাণু সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এবং নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, কূটনীতি ও আলোচনাই যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের একমাত্র পথ, এই চুক্তি তা প্রমাণ করেছে। কাতার এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির ঘোষণার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম যেমন কমেছে, তেমনি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের উত্থান। চার মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানের খবরে স্বস্তিতে ফিরেছেন বিনিয়োগকারীরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩ দশমিক ৪০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, এই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্পের ঘোষণার পর তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
শেয়ারবাজারে বড় উত্থান: সোমবার সকালে লেনদেন শুরু হতেই এশিয়ার বাজারে চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা যায়।
মার্কিন শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নিয়মিত লেনদেনের বাইরে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ১% এবং নাসদাক ফিউচার ১.৮% বেড়েছে।
এএনজেডের এশিয়া গবেষণা প্রধান খুন গো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষদিকে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকেই বাজার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসায় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান হয়েছে।’
ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে। এতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করার শর্ত রয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে এই চুক্তি নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল। বিশেষ করে বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান, কাতার, সৌদি ও তুরস্কের যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই শান্তি চুক্তি আলোর মুখ দেখল।
চুক্তির খবরে বাজার চাঙ্গা হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নৌ-পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
নরওয়েজিয়ান শিপ ওনার্স মিউচুয়াল ওয়ার রিস্কস ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সভেন রিংবাক্কেন বলেন, ‘হাজার হাজার জাহাজ এই জলসীমায় ও এর আশপাশে আটকে আছে। পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কয়েক মাস লেগে যাবে। এছাড়া যদি সাগরে মাইন পাতা থাকে, তবে সেগুলো অপসারণ করতেও দীর্ঘ সময় লাগবে।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সেফসি গ্রুপের চেয়ারম্যান এসভি আনচান এই চুক্তি নিয়ে এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী হতে রাজি নন। তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে শান্তি চুক্তি হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কী, তা দেখতে হবে। সাগরের মাইন কীভাবে সরানো হবে, বিমাকারীরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম কমায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচবে।
আগামী শুক্রবার স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে। এরপর দেখার বিষয়, কাগজের এই চুক্তি মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে কি সত্যিই স্থায়ী শান্তি ফিরে আসে। সূত্র: আল-জাজিরা ও মেহর নিউজ।
সারসংক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ কমেছে এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ৫ শতাংশের মতো উত্থান হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কাতার, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে। তবে নৌ-পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে পুরোপুরি স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন