প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। তবে নতুন ইউনিয়নগুলোর সীমানা বা জনসংখ্যার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তাদের নাম। কারণ, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী নতুন চারটি ইউনিয়নের মধ্যে একটি ইউনিয়নের নাম মিলে গেছে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বংশীয় পরিচয়ের সঙ্গে, আর বাকি দুটি ইউনিয়নের নাম মিলে গেছে তার দুই ছেলের নামের সঙ্গে।
এ বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার পর সোমবার (১৫ জুন) সংসদে ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী নিজেই। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদে।
সংসদে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এলাকার দুটি উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন হয়েছে। সেখানে ওনার পরিবার বা মীর বংশের নামে একটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে। ওনার দুই সন্তানের নামে দিগন্ত ও সীমান্ত—এই দুই নামে দুইটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে।”
পরে সংসদে ২৭৪ বিধিতে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি ব্যাখ্যা করেন, তার এলাকার সৈয়দপুর ও দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে নতুন দুই ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকা মোকামতলার দূরবর্তী দুইটি ইউনিয়ন সৈয়দপুর ও দেউলী। এই দুইটি ইউনিয়ন অনেক বড় ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই করে গণশুনানি করে সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলা সীমান্তে, সেই কারণে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করেছে সীমান্ত ইউনিয়ন।”
তিনি আরও বলেন, “আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। যেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে দিগন্ত ইউনিয়ন।”
এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নামে যে সব স্থান রয়েছে, সেগুলোর উদাহরণ টানেন। পরে জামায়াত এমপির উদ্দেশে মীর শাহে আলম বলেন, “এরকম সীমান্ত ও দিগন্ত নামকরণ বহু নাম বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। উনি কেন এর সাথে আমার সন্তানদের নাম জড়ালেন?”
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “মিরাক্যালি (অলৌকিকভাবে) আমার সন্তানদের নামের সাথে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকতো সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার, তাহলে তো আমি প্রশাসনকে বলতাম ‘মীর সীমান্ত’ ও ‘মীর দিগন্ত’ রাখার। কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে তো ‘মীর’ নাই, মাননীয় স্পিকার।”
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন করে গঠন করা হয়েছে মীরবাড়ি ইউনিয়ন। অন্যদিকে নতুন ঘোষণা করা মোকামতলা উপজেলায় গঠন করা হয়েছে সীমান্ত ও দিগন্ত নামে দুটি নতুন ইউনিয়ন। এছাড়া মোকামতলা উপজেলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত হয়েছে স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন।
নতুন ইউনিয়নগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা নিচে উল্লেখ করা হলো:
স্থানীয়দের ভাষ্য, মীর শাহে আলমের পারিবারিক পরিচিতি ‘মীরবাড়ি’ নামে বহুল প্রচলিত। এখন সেটি প্রশাসনিক মানচিত্রে স্থায়ী রূপ পেল। শিবগঞ্জের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মীরবাড়ি নামটি এলাকার মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক পরিবারের পরিচিতি হিসেবে বেশি পরিচিত। সেটি এখন প্রশাসনিক মানচিত্রে স্থায়ী রূপ পেল।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোকামতলার বাসিন্দাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সীমান্ত ও দিগন্ত নামে এলাকায় আগে কোনো ইউনিয়ন, বড় জনপদ বা ঐতিহাসিক পরিচিতি ছিল না। তাহলে এই নাম দুটি কীভাবে এলো?
প্রশাসন ও প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রেস সেক্রেটারি আতিক রহমান জানান, স্থানীয়দের মতামত নিয়েই এই নামকরণ করা হয়েছে। সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মোত্তালেব এবং দেউলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই নাম প্রস্তাব করেন।
সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহিন জানান, ইউনিয়নগুলোর নাম সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকার কারণে ‘সীমান্ত’ এবং অনেক দূরের এলাকা হওয়ায় ‘দিগন্ত’ নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত লন্ডন থেকে এমবিএ পাস করার পর এক বছর আগে দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করেন। আর ছোট ছেলে মীর শাকরুল আলম দিগন্ত লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ছেন।
প্রতিমন্ত্রীর বেতগাড়ীতে অবস্থিত গ্রামের বাড়ির নাম ‘মীর বাড়ি’। সেই নামানুসারেই মীরবাড়ি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান নতুন ইউনিয়ন গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও নামকরণের পেছনের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রাজিয়া সুলতানাকেও বারবার ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় এছাড়া পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ ও নতুন পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। মোকামতলায় পৌরসভার অনুমোদন মিললে উপজেলাটি আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে পরিচালিত হবে।
নামকরণের এই ‘অলৌকিক’ মিল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত থাকলেও প্রতিমন্ত্রী নিজের অবস্থানে অনড়। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—সত্যিই কি এটি কাকতালীয়, নাকি প্রভাব? সংসদের বাইরেও বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমানভাবে আলোচিত।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন