অভিনব ও অদ্ভুত এক রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন চেক রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট পেটর পাভেল। তিনি দেশের সরকারের বিরুদ্ধেই সাংবিধানিক আদালতে মামলা করেছেন। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু—বিদেশে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, প্রেসিডেন্ট নাকি সরকার। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
আগামী মাসে ন্যাটো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সব ন্যাটো সম্মেলনেই চেক রিপাবলিকের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন পাভেল। ১৯৯৯ সালে চেক রিপাবলিক ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর থেকে দেশটির প্রেসিডেন্টরাই সাধারণত এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে আসন্ন সম্মেলনে পাভেলকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ধনকুবের ও জাতীয়তাবাদী নেতা আন্দ্রেই বাবিসের নেতৃত্বাধীন সরকার জানিয়েছে, সাবেক ন্যাটো জেনারেল পাভেল এবার আঙ্কারার সম্মেলনে অংশ নেবেন না। এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী নিজেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাবেন।
এ সিদ্ধান্তের পরই সাংবিধানিক আদালতের শরণাপন্ন হন পাভেল। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ও সরকারের বিদেশে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করতেই তিনি ‘ক্ষমতা-সংক্রান্ত মামলা’ করেছেন। বিশেষ করে ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন থেকেই এ বিরোধের সূত্রপাত। সরকারের এ পদক্ষেপকে তিনি ‘নজিরবিহীন’ ও ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেন। তার দাবি, সংবিধান অনুযায়ী দেশের বাইরে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার প্রেসিডেন্টের রয়েছে। এদিকে সাংবিধানিক আদালত জানিয়েছে, মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বাবিস বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্টের আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ‘আমি মনে করি না এটি ভালো সিদ্ধান্ত।’ তার ভাষ্য, ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল ‘বাস্তবসম্মত’। বর্তমানে বাবিস তার দল এএনও মুভমেন্ট, কট্টর ডানপন্থি ফ্রিডম অ্যান্ড ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি (এসপিডি) এবং মোটরিস্টস—এই তিন দলের জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফে পাভেলের কাছে পরাজিত হন বাবিস। এরপর থেকেই দুজনের সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়। বিশেষ করে গত বছরের শেষ দিকে বাবিসের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠনের সময় কয়েকজন নেতার নিয়োগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জোটের শরিক মোটরিস্ট পার্টির নেতা ফিলিপ তুরেককে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে অস্বীকৃতি জানান প্রেসিডেন্ট পাভেল। ফিলিপের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, বর্ণবাদী আচরণ ও নারীবিদ্বেষী মনোভাবের অভিযোগ রয়েছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট পাভেলের অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন লাখো চেক নাগরিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এই বিরোধ চেক রিপাবলিকের সাংবিধানিক কাঠামোকে নতুন করে পরীক্ষা করবে। এই মামলার রায় দেশটির ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট পাভেল জানিয়েছেন, তিনি আদালতের রায় মেনে নেবেন এবং সেটিই হবে এই বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান। তবে মামলার ফলে সরকার ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চেক প্রেসিডেন্টের এই অভিনব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতা বন্টন নিয়ে জটিলতা থাকলেও আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি তুলনামূলকভাবে বিরল। আগামী মাসের ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে এই বিরোধের সমাধান হলে চেক রিপাবলিকের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও স্বার্থ রক্ষা সহজ হবে। অন্যথায় এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন