ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন একই সঙ্গে ঈমান, জ্ঞান, সাহস ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদেরই একজন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)। তিনি ছিলেন একাধারে একজন অকুতোভয় মুজাহিদ, অসাধারণ কবি, দূরদর্শী দাঈ এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিবেদিতপ্রাণ সাহাবি। কলম ও তরবারি—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ইসলামের পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, একজন মুমিনের প্রতিভা কেবল ব্যক্তিগত খ্যাতির জন্য নয়; বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসর্গিত হওয়াই তার প্রকৃত মর্যাদা।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) মদিনার প্রসিদ্ধ খাজরাজ গোত্রের সন্তান ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের প্রথম যুগেই তিনি ঈমানের আলোয় আলোকিত হন। ইতিহাসে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়, কারণ তিনি সেই বারোজন আনসার নেতার অন্যতম ছিলেন, যারা আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক বাইয়াতই পরবর্তীতে মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করে।
তিনি শুধু ইসলাম গ্রহণ করেই থেমে থাকেননি; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের বিজয় ও প্রসারের জন্য।
আরব সমাজে কবিতা ছিল মতাদর্শ, সংস্কৃতি ও জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান কবি। ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁর কবিতা ছিল প্রচলিত আরব ঐতিহ্যের ধারায়; কিন্তু ঈমান গ্রহণের পর তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন উদ্দেশ্য লাভ করে।
তিনি কবিতার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদা বর্ণনা করতেন এবং মুশরিকদের মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতেন। তাঁর কবিতা মুসলিমদের মনোবল দৃঢ় করত এবং শত্রুদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিত।
কবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) এবং কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর সঙ্গে তিনিও ইসলামের পক্ষ থেকে কাব্যযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদের এই সাহিত্যিক সংগ্রামকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করতেন। বর্ণিত আছে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-কে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন:
"তুমি তাদের (মুশরিকদের) ব্যঙ্গ করো; তোমার সঙ্গে জিবরাঈল (আ.) আছেন।"
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর জীবনের সর্বাধিক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো মুতার যুদ্ধ।
রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ ধারাবাহিকভাবে তিনজন সেনাপতি মনোনীত করেছিলেন—জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.), জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং তৃতীয় হিসেবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)।
যুদ্ধের আগে তাঁকে কাঁদতে দেখা যায়। সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসার কারণে কাঁদছেন না; বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সেই ঘোষণার কথা স্মরণ করে কাঁদছেন যে, প্রত্যেক মানুষকে জাহান্নামের ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। তিনি চিন্তিত ছিলেন—তিনি সেই পরীক্ষায় সফলভাবে পার হতে পারবেন কি না। তাঁর এই বক্তব্য একজন মুমিনের গভীর তাকওয়া, আত্মসমালোচনা ও আখিরাতমুখী হৃদয়ের পরিচয় বহন করে।
মুতার যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলিম বাহিনী যখন রোমানদের বিপুল সৈন্যসংখ্যা দেখে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন—
"হে ভাইয়েরা! আল্লাহর কসম, তোমরা যে বিষয়টিকে অপছন্দ করছ—শাহাদাত—সেই উদ্দেশ্যেই তো তোমরা বের হয়েছ। আমরা সংখ্যার জোরে কিংবা শক্তির অহংকারে যুদ্ধ করি না। আমরা যুদ্ধ করি সেই দ্বীনের জন্য, যা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। এগিয়ে চলো! হয় আমরা বিজয় লাভ করব, নয়তো শাহাদাত অর্জন করব—উভয়ই আমাদের জন্য কল্যাণ।"
এই ভাষণ মুসলিম বাহিনীর মধ্যে নতুন সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ঈমানি দৃঢ়তা সৃষ্টি করেছিল। সংখ্যার হিসাব নয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাহায্যের ওপর নির্ভর করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল শিক্ষা।
মুতার যুদ্ধে প্রথমে জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) শহীদ হন। এরপর পতাকা গ্রহণ করেন জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.)। তিনিও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
এরপর ইসলামের পতাকা তুলে নেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)। তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। শত্রুর প্রবল আক্রমণের মুখেও তিনি পিছিয়ে যাননি। শেষ পর্যন্ত গুরুতর আহত হয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার পথে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
সেই সময় মদিনায় অবস্থান করেও রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বিশেষ ব্যবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা সাহাবিদের সামনে বর্ণনা করছিলেন। তিনি বললেন—
"জায়েদ শহীদ হলেন। তারপর জাফর শহীদ হলেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা গ্রহণ করলেন এবং তিনিও শহীদ হলেন।"
এ কথা বলতে বলতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। এতে তাঁর প্রিয় সাহাবিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধের প্রতিফলন ঘটে।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর জীবনের আরেকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা তাঁর আনুগত্যের গভীরতা তুলে ধরে।
একবার তিনি মসজিদের দিকে আসছিলেন। ঠিক তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলতে শুনলেন, "তোমরা বসে পড়ো।" তিনি মনে করলেন, এই নির্দেশ তাঁর জন্যও প্রযোজ্য। তাই মসজিদে প্রবেশ না করেই রাস্তার ওপর বসে পড়লেন। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর এই আনুগত্য দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
এ ঘটনা শিক্ষা দেয়—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার রাসুলের নির্দেশের প্রতি একজন মুমিনের আনুগত্য কতটা নিখুঁত ও আন্তরিক হওয়া উচিত।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর জীবন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং প্রতিটি যুগের মুসলমানের জন্য জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি—
ইতিহাসে বহু বীরের নাম লেখা আছে। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা একই সঙ্গে কলম, কণ্ঠ ও তরবারির মাধ্যমে সত্যের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ছিলেন সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন। তাঁর কবিতা ঈমানকে জাগ্রত করেছে, তাঁর ভাষণ ভীত হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করেছে এবং তাঁর শাহাদাত প্রমাণ করেছে—সত্যিকারের মুমিন কখনো সংখ্যা বা শক্তির হিসাব করে না; সে নির্ভর করে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ওপর।
আজকের মুসলিম সমাজে তাঁর জীবন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—যে জাতি ঈমান, জ্ঞান, সাহস ও আত্মত্যাগকে ধারণ করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাহায্য তাদের সঙ্গেই থাকে। তাঁর জীবন তাই শুধু অতীতের গৌরবগাথা নয়; বরং প্রতিটি ঈমানদারের জন্য চিরন্তন প্রেরণার আলোকবর্তিকা।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন