সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানীর একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তাকে আটক করে এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বয়স এখন ৭৭ বছর।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই উপস্থিত ছিলেন মোজাফফর । ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে সূত্রের তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মোজাফফরের অবস্থান শনাক্ত করে বনানীর ওই বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে অবহিত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে মোজাফফরের উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত 'বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড' বইয়ে জিয়া হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন । বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায় অনুযায়ী, ভোররাতে গোলাগুলির শব্দে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোজাফফর সেই মুহূর্তে দৃশ্যত কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। বইটিতে বলা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন তখনো মনে করছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে ।
কিন্তু এরপরই লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াকে গুলি করেন । মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর তার সঙ্গীকে বলেছিলেন যে তিনি জানতেন না রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তার ধারণা ছিল, জিয়াকে শুধু বের করে আনা হবে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে পুনরায় সার্কিট হাউসে যান । সেখানে জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে 'গোপন কাগজপত্র' ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে নিয়ে যাওয়া হয় ।
ওই বইয়ে আরও বলা হয়েছে, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর 'বিপ্লবী পরিষদ' গঠনের ঘোষণা দেন।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছাড়েন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, সামনের জিপে ছিলেন মতিউর রহমান, মাহবুব, মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর । পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
জিয়া হত্যার পর 'বিদ্রোহের' অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয় । এদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন এবং তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি বিরল তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা 'এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক' বইয়ে। লরেন্স লিফশুলৎজের মতে, মইনুল নিজেই তাকে ওই অনুবাদ পাঠিয়েছিলেন । মইনুল লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন যে জিয়া হত্যার পলাতক অভিযুক্ত মেজর খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন এবং মোজাফফর ছিলেন ভারতে । একপর্যায়ে মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে মইনুলের সঙ্গে দেখা করেন।
মইনুলের বইয়েও মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী বলা হয়নি । তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় কোন তথ্যটি কার, তা স্পষ্ট নয়। মইনুল লিখেছেন, ১৯৯১ সালে ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই আলোচনার বিষয়বস্তু জানিয়েছিলেন । মেজর খালেদ পরে ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদরোগে মারা যান।
দীর্ঘ পলাতক জীবন শেষে মোজাফফরের গ্রেপ্তারে ৪৫ বছরের পুরোনো কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। সেদিন সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল, জিয়াকে হত্যা নাকি তুলে নেওয়া—কোন উদ্দেশ্যের কথা তারা জানতেন, পরিকল্পনায় আর কারা যুক্ত ছিলেন, হত্যার পর জিয়ার কক্ষে কী খোঁজা হয়েছিল এবং মরদেহ কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নে মোজাফফরের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন