ঢাকা    শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ঢাকা    শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
গণবার্তা

পাঠ্যবই ছাপাতে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়ানিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ

পাঠ্যবই ছাপাতে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়ানিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ

এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় থামছে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের মূল্য না বাড়লেও বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে সর্বোচ্চ দরে এবার প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়িয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে বইয়ের হিসাব 'ফর্মা' দিয়ে করা হয়, যেখানে ১৬ পৃষ্ঠায় ১ ফর্মা হয়। জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতে এনসিটিবি নির্ধারিত প্রতি ফর্মার সর্বোচ্চ দর ছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রথমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয় ৩ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু টেন্ডার লাইভে থাকাবস্থায় হঠাৎ বেআইনিভাবে ৩০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ফর্মার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ টাকা ৪০ পয়সা।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৩০ কোটি ৬১ লাখ পাঠ্যবইয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মা থাকে। সে হিসাবে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা দাম বাড়ানোয় সরকারের অপচয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এনসিটিবির সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'প্রতিবারের মতো এবারও বাজেট নির্ধারণ করে ই-টেন্ডার লাইভে দেওয়া হয়। টেন্ডার লাইভে থাকা অবস্থায় মূল্য বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ।'

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের মাসোহারা না দিয়ে পাঠ্যবই ছাপানোর ব্যবসা করা যায় না। ছাপানোর খরচ না বাড়লে তাদের এই মাসোহারার টাকা কোথা থেকে দেব? তাছাড়া মূল্য বৃদ্ধির ফলে যে অর্থ আসবে, তারও প্রায় দ্বিগুণ অর্থ বিভিন্ন স্তরে ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। এ কারণে প্রতি বছর নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপাতে বাধ্য হয় ছাপাখানাগুলো।'

কাগজ কেনার চুক্তি নিয়ে জটিলতা

বর্তমানে প্রতি টন কাগজের মূল্য এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। অভিযোগ উঠেছে, কাগজকল মালিকদের কাছ থেকে টনপ্রতি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কাগজ কিনতে লিখিত চুক্তি করার জন্য ছাপাখানার মালিকদের ওপর চাপ দিচ্ছে এনসিটিবি। অথচ এই ধরনের চুক্তির আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, 'কাগজকল মালিকদের সঙ্গে ছাপাখানার মালিকদের চুক্তি করাতে এনসিটিবিকে বলেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।'

পাঁচজন ছাপাখানার মালিক জানান, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর মৌসুমে কাগজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কাগজের মিল মালিকরা হাতিয়ে নেয় ৩৪৫ কোটি টাকা। তখন প্রতি টন কাগজের মূল্য বাড়ানো হয় ৩০ হাজার টাকা। এবার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাই কাগজকল মালিকদের প্রতিনিধি হয়ে তাদের ওপর অন্যায় চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে কাগজকল মালিক এবং ছাপাখানা মালিকদের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। পেপার মিল মালিকরা তাদের কাছ থেকে কাগজ কিনতে এনসিটিবির মধ্যস্থতায় ছাপাখানা মালিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে চায়। অন্যদিকে কাগজের অস্বাভাবিক মূল্যের জাঁতাকলে পড়ে অতীতে ছাপাখানা মালিকরা বারবার বিপাকে পড়েছেন। এ কারণে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির সুযোগ চেয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই বাড়তি অর্থ এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ব্যয় সংকোচন নীতির বিপরীতে গিয়ে সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা। এই রশি টানাটানি রুখতে ও শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই তুলে দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পেপার মিল ও প্রেস মালিকদের নিয়ে ইতিমধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬


পাঠ্যবই ছাপাতে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়ানিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬

featured Image
এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় থামছে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের মূল্য না বাড়লেও বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে সর্বোচ্চ দরে এবার প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা বাড়িয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে বইয়ের হিসাব 'ফর্মা' দিয়ে করা হয়, যেখানে ১৬ পৃষ্ঠায় ১ ফর্মা হয়। জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতে এনসিটিবি নির্ধারিত প্রতি ফর্মার সর্বোচ্চ দর ছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রথমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয় ৩ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু টেন্ডার লাইভে থাকাবস্থায় হঠাৎ বেআইনিভাবে ৩০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ফর্মার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ টাকা ৪০ পয়সা।প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৩০ কোটি ৬১ লাখ পাঠ্যবইয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মা থাকে। সে হিসাবে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা দাম বাড়ানোয় সরকারের অপচয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এনসিটিবির সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'প্রতিবারের মতো এবারও বাজেট নির্ধারণ করে ই-টেন্ডার লাইভে দেওয়া হয়। টেন্ডার লাইভে থাকা অবস্থায় মূল্য বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ।'বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের মাসোহারা না দিয়ে পাঠ্যবই ছাপানোর ব্যবসা করা যায় না। ছাপানোর খরচ না বাড়লে তাদের এই মাসোহারার টাকা কোথা থেকে দেব? তাছাড়া মূল্য বৃদ্ধির ফলে যে অর্থ আসবে, তারও প্রায় দ্বিগুণ অর্থ বিভিন্ন স্তরে ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। এ কারণে প্রতি বছর নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপাতে বাধ্য হয় ছাপাখানাগুলো।'কাগজ কেনার চুক্তি নিয়ে জটিলতাবর্তমানে প্রতি টন কাগজের মূল্য এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। অভিযোগ উঠেছে, কাগজকল মালিকদের কাছ থেকে টনপ্রতি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কাগজ কিনতে লিখিত চুক্তি করার জন্য ছাপাখানার মালিকদের ওপর চাপ দিচ্ছে এনসিটিবি। অথচ এই ধরনের চুক্তির আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, 'কাগজকল মালিকদের সঙ্গে ছাপাখানার মালিকদের চুক্তি করাতে এনসিটিবিকে বলেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।'পাঁচজন ছাপাখানার মালিক জানান, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর মৌসুমে কাগজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কাগজের মিল মালিকরা হাতিয়ে নেয় ৩৪৫ কোটি টাকা। তখন প্রতি টন কাগজের মূল্য বাড়ানো হয় ৩০ হাজার টাকা। এবার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাই কাগজকল মালিকদের প্রতিনিধি হয়ে তাদের ওপর অন্যায় চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।জানা গেছে, বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে কাগজকল মালিক এবং ছাপাখানা মালিকদের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। পেপার মিল মালিকরা তাদের কাছ থেকে কাগজ কিনতে এনসিটিবির মধ্যস্থতায় ছাপাখানা মালিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে চায়। অন্যদিকে কাগজের অস্বাভাবিক মূল্যের জাঁতাকলে পড়ে অতীতে ছাপাখানা মালিকরা বারবার বিপাকে পড়েছেন। এ কারণে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির সুযোগ চেয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা।শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই বাড়তি অর্থ এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ব্যয় সংকোচন নীতির বিপরীতে গিয়ে সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা। এই রশি টানাটানি রুখতে ও শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই তুলে দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পেপার মিল ও প্রেস মালিকদের নিয়ে ইতিমধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা