নতুন দিল্লি: দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এখন এই উদীয়মান নিরাপত্তা কাঠামোতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
একটি তুর্কি সংবাদপত্র বাংলাদেশকে এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে । তবে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনও এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের কাছে এই উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে কী হয়েছে?
৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কায় 'মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট' স্বাক্ষর করে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটির ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ নিরাপত্তা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশ কি এই প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগ দিতে পারে?
তুর্কি সংবাদপত্র 'ইয়েনি শাফাক' এই উদীয়মান প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রতিবেদনে পাকিস্তান ও তুরস্কের বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে । তবে বর্তমানে এটি শুধুমাত্র গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং কৌশলগত বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এই কাঠামোতে যোগদানের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা কিছু সময় ধরে চলছে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে তার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য উভয় দেশ প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর পদক্ষেপও নিয়েছে । এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশকে এই নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে সংযুক্ত করার বিষয়ে জল্পনা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই চুক্তিতে পাকিস্তানের ভূমিকা কী?
পাকিস্তান এই নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মক্কা চুক্তির মাধ্যমে এটি সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আনুষ্ঠানিক করার সুযোগ পেয়েছে । চুক্তিটি যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির দিকেও বিধান করে। তুরস্ক স্থল, সমুদ্র, আকাশ এবং সাইবার ডোমেনে যৌথ মহড়ার পাশাপাশি ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলেছে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের উদ্বেগ শুধু পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশও যদি এই কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সীমান্ত সংক্রান্ত উভয় দেশের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে, ঢাকার এমন একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের কাছাকাছি আসা নতুন দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উন্নয়ন হবে।
ভারতীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, "বাংলাদেশ অবশ্যই ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের যোগ্য, যেমনটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন করছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সম্প্রতি নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।"
পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এবং প্রশিক্ষণ সিমুলেটর স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপগুলি ইঙ্গিত দেয় যে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে । তবে চন্দ্র মনে করেন, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেও সেটি বড় ধরনের পদক্ষেপ হবে। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের পক্ষে যোগদান সম্ভব, কিন্তু তা অনিশ্চিত ভবিষ্যতে একটি বড় লাফ হবে।"
ভারতের প্রতিক্রিয়া কী?
ভারত সরকার এই উন্নয়নের ওপর নজর রাখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন দিল্লি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবগুলি মূল্যায়ন করছে । সরকার দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে স্পষ্ট করেছে।
ভারতের সাবেক সেনা উপপ্রধান সতীন্দর কুমার সাইনি বলেন, মক্কা চুক্তি "একে অপরের অঞ্চল রক্ষার প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সংকেত" । বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভিন্ন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যেও এই চুক্তির সম্প্রসারণ সীমিত করতে পারে।
'ইসলামিক ন্যাটো' বলে ডাকা যাবে কি?
বর্তমানে একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা অকালপক্ব হবে। তিনটি দেশই এই চুক্তিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক এবং সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তুরস্ক ভবিষ্যতে অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশে এর সম্প্রসারণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু এর গঠন এবং প্রকৃত সামরিক প্রতিশ্রুতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তাই, বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি বর্তমানে শুধুমাত্র একটি কৌশলগত সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কোনো সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন