ঢাকা    শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
গণবার্তা

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়: দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়: দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)। অন্যদিকে চার আসামিকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন- রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, আবদুর রহিম শরিফ ও ইফতেখার উদ্দিন রানা।

অন্যদিকে খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন- হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

এ সময় সঠিক রায় দিতে না পারায় নিম্ন আদালতের বিচারককে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আদালতে আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।

রায়কে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নুসরাতের সোনাগাজীর বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পূর্বে তাদের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সর্বদা নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে সেখানে আরও ৭ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমরা চাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পূর্বের রায় বহাল থাকবে। হত্যায় জড়িত আসামিরা আইনের ফাঁকফোকরে কৌশলে যেন পার পেয়ে না যায়। আমাদের একটাই দাবি ন্যায়বিচার।

এর আগে গত ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু করেছিল।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরীন আখতার মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায় এবং ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলাটি নম্বরভুক্ত হয়। আসামিরাও নিজেদের দণ্ডের বিরুদ্ধে পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার হাইকোর্টে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হলো।

প্রসঙ্গত, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ‘নুসরাতের ন্যায়বিচার’ দাবিতে আন্দোলন ও ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। আজকের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনের খালাসের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া আইনি মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র মনোভাব সৃষ্টি করেছে। রায়ের বিরুদ্ধে পক্ষগুলো আপিল বিভাগে যেতে পারে বলে জানা গেছে।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়: দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি।সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন।মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)। অন্যদিকে চার আসামিকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন- রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, আবদুর রহিম শরিফ ও ইফতেখার উদ্দিন রানা।অন্যদিকে খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন- হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।এ সময় সঠিক রায় দিতে না পারায় নিম্ন আদালতের বিচারককে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।আদালতে আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।রায়কে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নুসরাতের সোনাগাজীর বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পূর্বে তাদের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সর্বদা নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে সেখানে আরও ৭ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমরা চাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পূর্বের রায় বহাল থাকবে। হত্যায় জড়িত আসামিরা আইনের ফাঁকফোকরে কৌশলে যেন পার পেয়ে না যায়। আমাদের একটাই দাবি ন্যায়বিচার।এর আগে গত ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু করেছিল।নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরীন আখতার মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায় এবং ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলাটি নম্বরভুক্ত হয়। আসামিরাও নিজেদের দণ্ডের বিরুদ্ধে পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার হাইকোর্টে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হলো।প্রসঙ্গত, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ‘নুসরাতের ন্যায়বিচার’ দাবিতে আন্দোলন ও ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। আজকের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনের খালাসের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া আইনি মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র মনোভাব সৃষ্টি করেছে। রায়ের বিরুদ্ধে পক্ষগুলো আপিল বিভাগে যেতে পারে বলে জানা গেছে।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা