ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
গণবার্তা

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

জে-১০সিই কেনার পথে বাংলাদেশ: সামরিক সক্ষমতা না চীনা নির্ভরতা?

জে-১০সিই কেনার পথে বাংলাদেশ: সামরিক সক্ষমতা না চীনা নির্ভরতা?

বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনে, তাহলে দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়বে। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসছে—নতুন যুদ্ধবিমান কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে চীনের আরও বড় একটি সামরিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?

বাংলাদেশের জে-১০সিই কেনার প্রস্তাবটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। একটি খসড়া প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, পুরো প্যাকেজে আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহনের হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন আকাশযানও থাকার কথা রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই কেনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তা না হলে সেটি চলে যেতে পারে পরবর্তী বাজেট চক্রে।

বাংলাদেশ ২০ থেকে ২৪টি জে-১০সিই কেনার কথা ভাবছে। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের মূল দাম প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু দামই শেষ কথা নয়। প্রশিক্ষণ, রসদ, অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে প্রতিটি যুদ্ধবিমানের পেছনে মোট ব্যয় প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

জে-১০সিই নিয়ে এত আগ্রহ কেন?

জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে ২০২৫ সালের মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের প্রভাব থাকতে পারে। ওই সংঘর্ষে পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের জে-১০সিই ভারতীয় কয়েকটি যুদ্ধবিমান, এমনকি রাফালও ভূপাতিত করেছে। তবে পাকিস্তানের দাবিটি এখনো বিতর্কিত এবং স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও সংঘর্ষে জে-১০সিই-এর ব্যবহার এই যুদ্ধবিমানটির প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানই এখন পর্যন্ত এই রপ্তানি সংস্করণের একমাত্র নিশ্চিত বিদেশি ব্যবহারকারী।

তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। পাকিস্তানের জে-১০সিই যে সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার পুরোটা হয়তো শুধু যুদ্ধবিমানটির নিজের ক্ষমতা নয়। পাকিস্তান এসব যুদ্ধবিমান একা ব্যবহার করেনি। এর পেছনে ছিল চীনা প্রযুক্তিনির্ভর একটি বড় সামরিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ যুদ্ধবিমান, রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ থেকে নজরদারি ও নির্দেশনা দেওয়ার বিমান—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। তাই বাংলাদেশ শুধু জে-১০সিই কিনলেই পাকিস্তানের মতো একই ধরনের সক্ষমতা পেয়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

জে-১০সিই আর জেএফ-১৭

বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নের আলোচনায় এর আগে চীন-পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩-এর নামও এসেছে। জে-১০ এবং জেএফ-১৭কে একই ধরনের বিমান হিসেবে দেখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হবে। দুটির কাজ অনেকটা আলাদা। জে-১০ তুলনামূলক ভারী এবং এর মূল শক্তি আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, উন্নত রাডার ও বেশি গতিশীলতা। অন্যদিকে জেএফ-১৭ হালকা, তুলনামূলক কম খরচে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহার করা সম্ভব।

দুটি বিমান একসঙ্গে থাকলে বাংলাদেশ একটি ‘হাই-লো’ ধরনের যুদ্ধবিমান কাঠামো পেতে পারে। সহজ করে বললে, বেশি কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ আকাশপ্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকতে পারে জে-১০। আর নিয়মিত আকাশ টহল ও আঘাত হানার মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে জেএফ-১৭।

আসল বিষয় যুদ্ধবিমান নয়

২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে পাকিস্তানের জে-১০সিই-এর কথিত সাফল্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, যুদ্ধবিমানগুলোর সঙ্গে চীনা প্রযুক্তির আরও অনেক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করেছিল। সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের চীনা তৈরি স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় বিমান শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করার কাজে যুক্ত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের চীনা তৈরি যুদ্ধবিমানগুলো চীনা প্রযুক্তিনির্ভর আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণের বিমানের সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

অর্থাৎ একটি যুদ্ধবিমান যত আধুনিকই হোক, তার পুরো সক্ষমতা পেতে হলে সেটিকে রাডার, নজরদারি, যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং কমান্ড ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চালাতে হয়। এখানেই বাংলাদেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। জে-১০সিই কেনার পর যদি এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগাতে আরও চীনা প্রযুক্তি ও সহায়তা প্রয়োজন হয়, তাহলে বাংলাদেশের চীনা সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কও আরও গভীর হতে পারে।

যুদ্ধবিমান কিনলেই কাজ শেষ নয়

একটি যুদ্ধবিমান কেনার পর সেটিকে বছরের পর বছর সচল রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ। উন্নত যুদ্ধবিমানের জন্য নিয়মিত খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার হালনাগাদ, প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার হয়। ফলে অস্ত্র কেনার চুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই একটি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ও সহায়তা সম্পর্কও তৈরি হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত ২০ বছরে কেনা মোট অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে আটকে নেই। এসব সরঞ্জাম সচল রাখতে যে খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার, সেগুলোর সঙ্গেও চীনের সম্পর্ক তৈরি হয়।

দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা

দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা চীনের প্রভাবকে অস্ত্রের বাজারের বাইরেও নিয়ে যেতে পারে। একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত বেশি একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে, তার প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও তত বেশি সেই দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের কয়েক দশকের চীনা অস্ত্রনির্ভরতা একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়িয়ে এই নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।

এরই মধ্যে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এগিয়েছে। দুই দেশ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘টু প্লাস টু’ আলোচনা আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সামরিক সরঞ্জাম কেনাবেচার সম্পর্ক না রেখে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির উচ্চপর্যায়েও সম্পর্ককে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এছাড়াও তুরস্কের বাইরে জাপানের সঙ্গেও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তরের সুযোগ তৈরির জন্য একটি চুক্তি করেছে।

বাংলাদেশের জে-১০সিই ও জেএফ-১৭ কেনার পরিকল্পনা দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ব্যবধান কিছুটা কমাবে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা শুধু বিমানের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যে রাডার, অস্ত্র, যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্ত থাকে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পুরো ব্যবস্থাই যদি ক্রমশ চীনকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ যে সামরিক সক্ষমতা অর্জন করছে, তা একদিকে তার বিকল্প বাড়াবে, আবার অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত স্বাধীনতার জায়গাটিও সংকুচিত করতে পারে।

বিষয় : প্রতিরক্ষা

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


জে-১০সিই কেনার পথে বাংলাদেশ: সামরিক সক্ষমতা না চীনা নির্ভরতা?

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image
বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনে, তাহলে দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়বে। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসছে—নতুন যুদ্ধবিমান কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে চীনের আরও বড় একটি সামরিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?বাংলাদেশের জে-১০সিই কেনার প্রস্তাবটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। একটি খসড়া প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, পুরো প্যাকেজে আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহনের হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন আকাশযানও থাকার কথা রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই কেনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তা না হলে সেটি চলে যেতে পারে পরবর্তী বাজেট চক্রে।বাংলাদেশ ২০ থেকে ২৪টি জে-১০সিই কেনার কথা ভাবছে। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের মূল দাম প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু দামই শেষ কথা নয়। প্রশিক্ষণ, রসদ, অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে প্রতিটি যুদ্ধবিমানের পেছনে মোট ব্যয় প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।জে-১০সিই নিয়ে এত আগ্রহ কেন?জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে ২০২৫ সালের মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের প্রভাব থাকতে পারে। ওই সংঘর্ষে পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের জে-১০সিই ভারতীয় কয়েকটি যুদ্ধবিমান, এমনকি রাফালও ভূপাতিত করেছে। তবে পাকিস্তানের দাবিটি এখনো বিতর্কিত এবং স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও সংঘর্ষে জে-১০সিই-এর ব্যবহার এই যুদ্ধবিমানটির প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানই এখন পর্যন্ত এই রপ্তানি সংস্করণের একমাত্র নিশ্চিত বিদেশি ব্যবহারকারী।তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। পাকিস্তানের জে-১০সিই যে সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার পুরোটা হয়তো শুধু যুদ্ধবিমানটির নিজের ক্ষমতা নয়। পাকিস্তান এসব যুদ্ধবিমান একা ব্যবহার করেনি। এর পেছনে ছিল চীনা প্রযুক্তিনির্ভর একটি বড় সামরিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ যুদ্ধবিমান, রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ থেকে নজরদারি ও নির্দেশনা দেওয়ার বিমান—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। তাই বাংলাদেশ শুধু জে-১০সিই কিনলেই পাকিস্তানের মতো একই ধরনের সক্ষমতা পেয়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।জে-১০সিই আর জেএফ-১৭বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নের আলোচনায় এর আগে চীন-পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩-এর নামও এসেছে। জে-১০ এবং জেএফ-১৭কে একই ধরনের বিমান হিসেবে দেখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হবে। দুটির কাজ অনেকটা আলাদা। জে-১০ তুলনামূলক ভারী এবং এর মূল শক্তি আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, উন্নত রাডার ও বেশি গতিশীলতা। অন্যদিকে জেএফ-১৭ হালকা, তুলনামূলক কম খরচে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহার করা সম্ভব।দুটি বিমান একসঙ্গে থাকলে বাংলাদেশ একটি ‘হাই-লো’ ধরনের যুদ্ধবিমান কাঠামো পেতে পারে। সহজ করে বললে, বেশি কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ আকাশপ্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকতে পারে জে-১০। আর নিয়মিত আকাশ টহল ও আঘাত হানার মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে জেএফ-১৭।আসল বিষয় যুদ্ধবিমান নয়২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে পাকিস্তানের জে-১০সিই-এর কথিত সাফল্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, যুদ্ধবিমানগুলোর সঙ্গে চীনা প্রযুক্তির আরও অনেক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করেছিল। সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের চীনা তৈরি স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় বিমান শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করার কাজে যুক্ত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের চীনা তৈরি যুদ্ধবিমানগুলো চীনা প্রযুক্তিনির্ভর আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণের বিমানের সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।অর্থাৎ একটি যুদ্ধবিমান যত আধুনিকই হোক, তার পুরো সক্ষমতা পেতে হলে সেটিকে রাডার, নজরদারি, যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং কমান্ড ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চালাতে হয়। এখানেই বাংলাদেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। জে-১০সিই কেনার পর যদি এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগাতে আরও চীনা প্রযুক্তি ও সহায়তা প্রয়োজন হয়, তাহলে বাংলাদেশের চীনা সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কও আরও গভীর হতে পারে।যুদ্ধবিমান কিনলেই কাজ শেষ নয়একটি যুদ্ধবিমান কেনার পর সেটিকে বছরের পর বছর সচল রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ। উন্নত যুদ্ধবিমানের জন্য নিয়মিত খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার হালনাগাদ, প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার হয়। ফলে অস্ত্র কেনার চুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই একটি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ও সহায়তা সম্পর্কও তৈরি হয়।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত ২০ বছরে কেনা মোট অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে আটকে নেই। এসব সরঞ্জাম সচল রাখতে যে খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার, সেগুলোর সঙ্গেও চীনের সম্পর্ক তৈরি হয়।দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতাদীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা চীনের প্রভাবকে অস্ত্রের বাজারের বাইরেও নিয়ে যেতে পারে। একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত বেশি একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে, তার প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও তত বেশি সেই দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের কয়েক দশকের চীনা অস্ত্রনির্ভরতা একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়িয়ে এই নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।এরই মধ্যে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এগিয়েছে। দুই দেশ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘টু প্লাস টু’ আলোচনা আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সামরিক সরঞ্জাম কেনাবেচার সম্পর্ক না রেখে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির উচ্চপর্যায়েও সম্পর্ককে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এছাড়াও তুরস্কের বাইরে জাপানের সঙ্গেও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তরের সুযোগ তৈরির জন্য একটি চুক্তি করেছে।বাংলাদেশের জে-১০সিই ও জেএফ-১৭ কেনার পরিকল্পনা দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ব্যবধান কিছুটা কমাবে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা শুধু বিমানের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যে রাডার, অস্ত্র, যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্ত থাকে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পুরো ব্যবস্থাই যদি ক্রমশ চীনকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ যে সামরিক সক্ষমতা অর্জন করছে, তা একদিকে তার বিকল্প বাড়াবে, আবার অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত স্বাধীনতার জায়গাটিও সংকুচিত করতে পারে।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা