খুলনা: খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন ওরফে আযম (২৩) ভাত চুরির অপবাদে মারধরের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি ছাত্র মেসে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আজমুল চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে তিনি বড়। মাত্র ১০ দিন আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। এর আগে বছরখানেক ধরে লেখাপড়ার জন্য খুলনায় ছিলেন।
নিহতের পরিবার ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আজমুলকে ওই মেসের চারতলার ছাদে নিয়ে কয়েকজন মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা সেখান থেকে চলে যান বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইসলামনগর রোডের চারতলা ভবনটির পুরোটাই ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। আজমুল ওই ভবনের ডি-৮ কক্ষের ভাড়াটিয়া ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, শুক্রবার রাতে মেসের ভাত খেয়ে ফেলার বিষয়কে কেন্দ্র করে আজমুলের সঙ্গে কয়েকজনের কথা কাটাকাটি হয়। পরে মেসের ম্যানেজার মেহেদীসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগত তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাড়ির মালিক বলেন, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে পাশের ভবন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে তিনি বাইরে বের হন। এ সময় পাশের ভবনের চতুর্থ তলায় কয়েকজনকে একজনকে মারধর করতে দেখেন। পরে ওই ব্যক্তিকে নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
নিহত আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, “আজমুল মাত্র ১০ দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। বছরখানেক আগে লেখাপড়ার জন্য খুলনায় এসেছিল। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় আমরা অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।”
তিনি আরও বলেন, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে আজমুল ফোন করে ভালো থাকার কথা জানিয়েছিল। পরে গভীর রাতে একটি ছেলে আজমুলের ফোন নম্বর থেকে কল করে এক লাখ টাকা নিয়ে খুলনায় আসতে বলে। ওই ব্যক্তি জানায়, আজমুল ঝামেলা করেছে। টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই বললেও দ্রুত আসতে বলা হয়। সকালে তিনি জানতে পারেন, তার ছেলে আর নেই।
কুতুব উদ্দিন বলেন, “যে ছেলে রাতে আমাকে চিন্তা করতে বারণ করল, সেই ছেলেকে অন্য ছাত্ররা পিটিয়ে মারল। আমি কারও কাছে বিচার দেব না। আমরা গরিব মানুষ। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে, খাজা হলের গেটের বাইরে একটি বাড়িতে ঘটেছে। বাড়িটি ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী থাকেন।
খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কানাই লাল সরকার বলেন, আজমুল সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে এবং পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, খবর পাওয়ার পরই পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে। মেসের অধিকাংশ সদস্য পালিয়ে গেছে। নিহতের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ওসি আরও জানান, নিহতের মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে মারধর করার অধিকার কারও আছে কি না। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন