মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ইতিহাস গড়লেন থালাপতি বিজয়
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া সি জোসেফ বিজয়। রোববার (১০ মে) সকালে চেন্নাইয়ে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ৬০ বছর পর তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরের কোনো রাজনৈতিক শক্তি সরকার গঠন করল।১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম রাজ্যের শাসনভার এমন একটি দলের হাতে গেল, যারা দীর্ঘদিনের দুই প্রধান দ্রাবিড় রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে অবস্থান করছে। ফলে বিজয়ের শপথকে তামিল রাজনীতির নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টিরি কাঝাগাম (টিভিকে) অভাবনীয় সাফল্য পেয়ে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে কয়েকদিন ধরে তুমুল রাজনৈতিক আলোচনা ও দর-কষাকষি চলে। রাজ্যপালের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক এবং সম্ভাব্য মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা শেষে অবশেষে সরকার গঠনের পথ সুগম হয়।২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় টিভিকের নিজস্ব আসনের পাশাপাশি কংগ্রেস, ভিসিকে, সিপিআই, সিপিআইএম এবং আইইউএমএলের সমর্থনে মোট ১২১ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করছেন বিজয়। তবে বিজয় নিজে দুটি আসনে জয় পাওয়ায় একটি আসন ছেড়ে দিতে হবে। ফলে কার্যকরভাবে জোটের শক্তি দাঁড়াচ্ছে ১২০ জনে।বিজয়ের এই ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণকে ঘিরে চেন্নাইজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। তার সমর্থকরা এটিকে তামিল রাজনীতির এক ‘নতুন সূর্যোদয়’ হিসেবে দেখছেন।তবে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিজয়ের নতুন মন্ত্রিসভা। কারণ, এই মন্ত্রিসভার বড় একটি অংশই গঠিত হচ্ছে তরুণ ও নতুন মুখ দিয়ে।টিভিকের নির্বাচনি সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল তরুণ ভোটাররা। দলটির ১০৭ জন বিধায়কের মধ্যে ৯৩ জনই প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, খোদ দলপ্রধান বিজয়ের জন্যও এটিই ছিল প্রথম নির্বাচনি লড়াই।দলটির বিধায়কদের গড় বয়স মাত্র ৪৫ বছর। সবচেয়ে কম বয়সী বিধায়কের বয়স ২৮ বছর। ৪০ বছরের নিচে রয়েছেন ৪১ জন বিধায়ক। আর ৬০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যের সংখ্যা মাত্র ১০ জন।দলের এক তরুণ নেতা জানিয়েছেন, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে টিভিকে তরুণদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। অন্য দলগুলোতে যেখানে প্রবীণদের প্রাধান্য বেশি, সেখানে বিজয় তরুণদের ওপর আস্থা রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের বিশাল তরুণ ভক্তগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ তৈরির কৌশল হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।তবে অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রাখতে অন্যান্য দল থেকে আসা অভিজ্ঞ নেতাদেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজয়ের দলে এমন আটজন বিধায়ক রয়েছেন, যারা এর আগেও বিধানসভার সদস্য ছিলেন।এদের মধ্যে এআইএডিএমকের সাবেক মন্ত্রী কে এ সেনগোট্টাইয়ান উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সাবেক ডিএমকে নেতা ভি এস বাবু এবারের নির্বাচনে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনকে পরাজিত করে বড় চমক দেখিয়েছেন। অভিজ্ঞদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক এআইএডিএমকে মন্ত্রী এন সুব্রামানিয়ান, পুদুচেরির সাবেক বিধায়ক ও টিভিকের সাধারণ সম্পাদক এন আনন্দ এবং জে সি ডি প্রভাকর।দলটির বিধায়কদের পেশাগত বৈচিত্র্যও বেশ লক্ষণীয়। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, ৪৬ জন ব্যবসায়ী, ১৯ জন আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া রয়েছেন ৯ জন চিকিৎসক, ৮ জন আইনজীবী এবং বিনোদন জগত থেকে আসা ৭ জন প্রতিনিধি।শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বেশ বৈচিত্র্য দেখা গেছে। দলটির ৬৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৭ জন বিধায়ক স্নাতক ডিগ্রিধারী। বিজয়সহ ১৫ জন উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং ২৪ জন মাধ্যমিক বা তার নিচের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন।তবে এই নতুন দলের বিধায়কদের মধ্যে বিতর্কও রয়েছে। নির্বাচনি তথ্য অনুযায়ী, ১০৭ জনের মধ্যে ৪০ জনের বিরুদ্ধে অন্তত একটি করে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বাকি ৬৭ জনের রেকর্ড সম্পূর্ণ স্বচ্ছ।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলচ্চিত্রজগতের জনপ্রিয়তা থেকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা বিজয়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করা, জোটের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।শপথের পর খুব দ্রুতই নতুন মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও সরকারের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণও দিতে হবে বিজয়কে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এই পরিবর্তন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।