ইরানের বিশ্বকাপ শুরু ড্র দিয়ে
ড্র করে বিশ্বকাপ শুরু করেছে ইরান। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে সমতায় থেকে মাঠ ছাড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নিউজিল্যান্ড কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে ইরানের। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দুইবার পিছিয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সমতা নিয়ে ৯০ মিনিটের খেলা শেষ করেছে তারা।ম্যাচে ৫৩ শতাংশ বল দখল করে এগিয়ে ছিল নিউজিল্যান্ড। তবে ১৭টি আক্রমণ করেছে ইরান, আর নিউজিল্যান্ড ১৩টি। ইরানের লক্ষ্যে রাখা ৪ শটের দ্বিগুণ ৮টি লক্ষ্যে রাখে নিউজিল্যান্ড।দলগত আক্রমণে প্রথম গোলের দেখা পায় নিউজিল্যান্ড। নিজেদের প্রান্ত থেকে গোলরক্ষকের ক্লিয়ারেন্স ইরানের প্রান্তে নিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণে নেন অধিনায়ক ক্রিস উড। তার কাছ থেকে বল পেয়ে যান এলিজা জাস্ট। তিনি দ্রুত বল বাড়ান সারপ্রিত সিংয়ের কাছে। চিপ শটে আবারও উডের কাছে বল ফেরত পাঠান সিং। বক্সে থাকা জাস্ট আরেকবার বল পেয়ে যান উডের কাছ থেকে। এবার জোরালো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। সপ্তম মিনিটে লিড নেয় নিউজিল্যান্ড।অস্বস্তি নিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচে খেলতে নামা ইরান চাপে পড়ে যায়। তবে তারা চেষ্টা চালায় ম্যাচে ফিরে আসার। সেই আক্রমণের সফলতা ধরা দেয় ৩২ মিনিটে। বক্সের বাইরে বল পান সালমান গহদ্দোস। দারুণ থ্রু পাস বাড়ান শাহরিয়ার মগহানলৌয়ের দিকে। তিনি দারুণ শট নিলেও নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার সারম্যান সেটি ব্লক করে দেয়। ভাগ্যক্রমে ইরানের রামিন রেজাইয়ানের সামনে গিয়ে পড়ে বল। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ইরানের হয়ে সমতা ফেরান তিনি।প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিউজিল্যান্ডের অর্ধে একটি ফ্রি-কিক পায় ইরান। রেজাইয়ান দারুণ এক ক্রসে বল তুলে দেন বক্সে। সেখানে থাকা নেমাতি বল জালে পাঠিয়ে উল্লাস শুরু করেন। তবে সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তুললে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে ১-১ সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।দ্বিতীয়ার্ধে নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোল করেন এলিজা জাস্ট। ৫৪তম মিনিটে ক্রিস উডের কাছ থেকে পাস পেয়ে বক্সে ঢুকেন তিনি। ইরানের গোলরক্ষককে পয়স্ত করে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে ইরানকে হতাশ করেন।যদিও মিনিট দশেকের বেশি লিড ধরে রাখতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। ৬৪তম মিনিটে ডান প্রান্তে বল পান রেজাইয়ান। দুর্দান্ত ক্রসে তিনি বল ভাসিয়ে দেন বক্সে। সেখানে দারুণভাবে উঠে হেড করেন মোহাম্মদ মোহেবি। নিখুঁত সেই হেড পোস্টের ভেতরের অংশে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। ফলে ম্যাচে আবারও সমতা ফেরায় ইরান।ইরানের হয়ে প্রথম গোলটি করেন রামিন রেজাইয়ান। গোলের পর দর্শকের দিকে ছুটে গিয়ে জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে এমন উদযাপনের কারণ প্রসঙ্গে রেজাইয়ান বলেন, ‘এটা কিছুটা রাজনৈতিক ছিল। এ নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।’লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের বাইরে প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশ বিক্ষোভ করে, যারা ইরানের বর্তমান শাসকদের বিরোধী। একটি অংশ খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীতের সময় দুয়ো দেয়। এ প্রসঙ্গে রেজাইয়ান বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল নিয়ে কথা বলতে এসেছি। যদি আমাদের মধ্যে (ইরানি দর্শক) কোনো সমস্যা থাকে, আমাদের ভেতরের ব্যাপার।’যুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরি সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে ইরান ফুটবলেও। খেলোয়াড়রা ভিসা পেলেও সাপোর্ট স্টাফদের একটা অংশ যুক্তরাষ্ট্রে অনুপস্থিত ছিলেন ভিসা না পেয়ে। টিকিট প্রাপ্তি নিয়েও জটিলতায় পড়েন ইরানের সমর্থকরা।খেলার আগে স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তারা ইরান সরকারের বিরুদ্ধে লেখা প্ল্যাকার্ড ও পতাকা প্রদর্শন করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এই ম্যাচে অংশ নেওয়া মানে তেহরান সরকারকে সমর্থন করা বোঝায়। তাই তারা ম্যাচে উপস্থিত হতে চাননি এবং সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।স্টেডিয়ামের ভেতরে কিছু দর্শক ইরানের জাতীয় সংগীত চলার সময় সেটিকে হুটিং করে অপমান করেন।ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই ঘোষণা শুনেই মাঠে নামে ইরানের ফুটবলাররা। যুদ্ধের আবহে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলতে পারবে কি না, তা নিয়েই ছিল বড় শঙ্কা। অবশেষে ভিসা দেয়া হলো, তবে বলা হলো ম্যাচ শেষ করে দিনে দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে ইরানকে।সেইসঙ্গে নিয়ম মেনে ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামে বাজলো ইরানের জাতীয় সংগীত, উড়লো জাতীয় পতাকা। তেতো হলেও আমেরিকানরা চোখের সামনে দেখল ইরানের পতাকা উড়ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুনতে হলো যুদ্ধের চরম প্রতিপক্ষ ইরানের জাতীয় সংগীত।এরপর একাধিক চেষ্টা চালায় দুই দলই। কিন্তু কেউই কোনো গোল করতে না পারায় ২-২ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ। আগামী ২২ জুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচে মাঠে নামবে ইরান। একইদিন মিশরের বিপক্ষে খেলবে নিউজিল্যান্ড। ইরানের পরবর্তী ম্যাচটিও লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। যুদ্ধের আবহেও ইরানি ফুটবলাররা দেখিয়েছে তারা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে পারে। দুইবার পিছিয়ে পড়েও ড্র করতে পারা ইরানের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো ব্যাপার।