ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
গণবার্তা

প্রবাসী মোকাররমকে ৮ টুকরো করে হত্যার পর বিরিয়ানি পার্টি প্রেমিকার: আদালতে স্বীকারোক্তি হেলেনার

প্রবাসী মোকাররম হত্যাকাণ্ড সিনেমার গল্পকেও যেন হার মানায়। প্রবাস থেকেই মোকাররম প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন একই গ্রামের আরেক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে। প্রেমিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে স্ত্রীকে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছিলেন মোকাররম। অন্যদিকে প্রেমিকা তাসলিমাও গ্রাম থেকে চলে আসেন রাজধানীতে। দু’জনই ওঠেন প্রেমিকার বান্ধবীর মান্ডার বাসায়। একপর্যায়ে অনৈতিক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে তাদের মধ্যে বচসা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত প্রেমিকা তাসলিমা ও তার বান্ধবী হেলেনা মিলে নৃশংসভাবে হত্যা করেন মোকাররমকে।হত্যাকাণ্ডের নৃশংস বর্ণনাপৈশাচিক কায়দায় লাশ ৮ টুকরো করে ফেলে দেয়া হয় এলাকার ময়লার ভাগাড়ে। হত্যার পর বাসার ছাদে বিরিয়ানি পার্টি করেন তারা। ঘটনার তিন দিন পর মান্ডা এলাকার একটি বাড়ির বেজমেন্ট থেকে পলিথিনে মোড়ানো মোকাররমের ৮ টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার মেয়ে হালিমা আক্তার (১৩) কে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৩। তবে পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক।পরিচয় ও পটভূমিচাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে গত সোমবার দুপুরে র‌্যাব-৩ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হয়। র‌্যাব-৩ এর উপ-অধিনায়ক মো. সাইদুর রহমান জানান, নিহত মোকাররমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রামে। তিনি গত ৩ বছর ধরে সৌদি আরব প্রবাসী ছিলেন। তার স্ত্রী জোনাকি আক্তার গৃহিণী। দুই ছেলে মুজাহিদ (৪) ও বায়জিদ (৬) মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকে।প্রেমের সূত্রপাত ও টাকা লেনদেনর‌্যাব জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের সৌদি প্রবাসী সুমনের সঙ্গে মোকাররমের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সৌদি আরব থেকেই সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়। পরিচয়ের একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা বলতেন। মোকাররম তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ লাখ টাকা দেন।দেশে ফেরা ও বচসাগত ১৩ মে কাউকে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন মোকাররম। তিনি তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার মান্ডার ভাড়া বাসায় ওঠেন। হেলেনা বেগমের এক রুমের বাসায় তাসলিমা, মোকাররম, হেলেনা ও তার দুই মেয়ে একসঙ্গে অবস্থান করেন। এ সময় ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করলে তা দেখে ফেলেন হেলেনা। এ নিয়ে তাসলিমা ও মোকাররমের বচসা হয়। একপর্যায়ে মোকাররম তাসলিমাকে দেয়া টাকা ফেরত দাবি করেন ও আপত্তিকর ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নএরপর তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরদিন সকালে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় তাকে। ওষুধের প্রভাবে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন হেলেনা। মোকাররম প্রাণে বাঁচতে হেলেনার হাতে কামড় দেন। এ সময় তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে তাকে আঘাতের চেষ্টা করেন। মোকাররম হাতুড়ি ছিনিয়ে নিলে হেলেনা পাশে থাকা বঁটি দিয়ে তার গলায় কোপ দেন ও মাটিতে ফেলে দেন। হেলেনার মেজো মেয়ে মাটিতে পড়ে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় আঘাত করে। পরে তাসলিমা ধারালো বঁটি দিয়ে আরও তিন-চারবার আঘাত করেন।লাশ টুকরো টুকরো ও নিষ্কাশনসবাই মিলে মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ বাথরুমে নিয়ে যান ও ঘর পরিষ্কার করেন। কিছুক্ষণ বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে প্রথমে পলিথিন ও পরে বস্তায় ভরে বাথরুমে রাখেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা পলিথিনে রাখার পর গত ১৪ মে রাত সাড়ে ১১টায় সুযোগ বুঝে সাত টুকরো ভাড়া বাসার নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেন। মাথার অংশ বাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে আসেন।হত্যার পর বিরিয়ানি পার্টিঘটনার পরদিন ১৫ মে সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে যান ও হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খান। বাসায় এসে রাতে ছাদে পার্টি করেন। পার্টিতে প্রতিবেশীদেরও অংশ নিতে অনুরোধ করেন তারা।গ্রেপ্তার ও আদালতের কার্যক্রমসোমবার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই দিন রাতে মরদেহ গ্রামে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহতের বাবা সোহরাব মিয়া সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।ওদিকে মঙ্গলবার আদালতে গ্রেপ্তার আসামি হেলেনা বেগম স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন তার জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠান। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় হেলেনার মেয়ে হালিমা আক্তারকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মনিরুজ্জামান এই আদেশ দেন।প্রেম, প্রতিশোধ, অর্থ ও নিষ্ঠুরতার এক অভূতপূর্ব মিশেল ঘটনাটি। মোকাররমের লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়ার পরেও হত্যার পর ‘বিরিয়ানি পার্টি’ প্রমাণ করে অপরাধীদের চরম নৈতিক পতন। হেলেনার স্বীকারোক্তি ও তার মেয়ের কিশোর কেন্দ্রে পাঠানো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। পলাতক তাসলিমা আক্তার এখনো ধরা পড়েনি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার এখন সময়ের দাবি।

প্রবাসী মোকাররমকে ৮ টুকরো করে হত্যার পর বিরিয়ানি পার্টি প্রেমিকার: আদালতে স্বীকারোক্তি হেলেনার