ঢাকা    শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
ঢাকা    শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
গণবার্তা

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস ২০২৬: ‘একটি ছোট রক্ত পরীক্ষা বদলে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ’

একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা দেখতে যতটা সহজ, তার প্রভাব ততটাই গভীর। কারণ এই ছোট পরীক্ষাই নির্ধারণ করে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন কতটা স্বাভাবিক হবে, নাকি শুরু থেকেই লড়তে হবে থ্যালাসেমিয়া নামক এক কঠিন বংশগত রোগের বিরুদ্ধে।অনেকেই জানেন না, তারা নিজেরাই এই রোগের বাহক হতে পারেন, আর সেই অজান্তেই নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও কষ্টের চক্রে। অথচ সময়মতো সচেতন হলে এই ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব।বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসপ্রতি বছর ৮ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এই দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং থ্যালাসেমিয়া নামক মারাত্মক বংশগত রক্তরোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, রোগ প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।থ্যালাসেমিয়া এমন একটি জেনেটিক রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলে রোগীকে সারাজীবন নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, যা তাদের জীবনে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।এ বছরের প্রতিপাদ্যএ বছরের প্রতিপাদ্য: ‘হিডেন নো মোর: ফাইন্ডিং দ্য আনডায়াগনোসড, সাপোর্টিং দ্য আনসিন’ (আর লুকিয়ে নয়: অজানা রোগীদের খুঁজে বের করা, অদেখা মানুষদের সহায়তা করা)।আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরে: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও রোগীদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। পরিবার, সমাজ, চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক এবং গণমাধ্যম—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপবাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানেন না যে তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না।অথচ দুইজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ২৫ শতাংশ। তাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে ক্যারিয়ার শনাক্ত করা।একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে খুব সহজেই জানা সম্ভব কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। এই তথ্যটি জানা থাকলে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্টকর রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।কী করা জরুরিবিবাহ-পূর্ব রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখন এসেছে। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জীবন সহজ নয়। নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, আয়রন চেলেশন থেরাপি এবং বিভিন্ন জটিলতার মোকাবিলা তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক পরিবার এই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ রক্ত সরবরাহ, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা রোগীদের জন্য অপরিহার্য।সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরিথ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। অনেক সময় তারা অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন, যা তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা।চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বর্তমানে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসায় নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেমন বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। তবে এটি ব্যয়বহুল এবং সবার নাগালের মধ্যে নয়। তাই প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত পথ।থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই পারে অনাগত শিশুর জীবনকে কষ্টমুক্ত রাখতে। অথচ অজ্ঞতার কারণেই বহু পরিবার এই রোগের কষ্ট বহন করতে বাধ্য হয়। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা ও ক্যারিয়ার শনাক্তকরণ নিশ্চিত করতে না পারলে থ্যালাসেমিয়া নির্মূল করা সম্ভব নয়। আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত, নিজে সচেতন হব, অন্যকে সচেতন করব। তবেই গড়ে তুলতে পারব থ্যালাসেমিয়ামুক্ত সুস্থ সমাজ।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস ২০২৬: ‘একটি ছোট রক্ত পরীক্ষা বদলে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ’