গণবার্তা

ষাট গম্বুজ মসজিদ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা বাগেরহাট। সবুজ শ্যামলিমা আর নদী-খাল বেষ্টিত এই জনপদকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি এনে দিয়েছে একটি অনন্য স্থাপনা – ষাট গম্বুজ মসজিদ। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী তিনটি স্থানের একটি এই মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। যেখানে ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর নির্মাণকৌশলের মিলন ঘটেছে চুন-সুরকি আর পাথরের বাঁধনে।ইতিহাসের আঁধার আলো: কে, কবে, কেন?মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মিত হয়েছিল, তা নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে স্থাপত্যশৈলী ঘেঁটে ইতিহাসবিদরা প্রায় নিশ্চিত – এ মসজিদ পীর খানজাহান আলী (রহ.)-এর হাতেই গড়ে উঠেছিল। ধারণা করা হয়, তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি (আনুমানিক ১৪৪২-১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ, অনেকের মতে ১৫০০ শতাব্দীতে) এটি নির্মাণ করেন।সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে খান-ই-জাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে ‘খলিফাতাবাদ’ রাজ্য গড়ে তোলেন। দরবার ও নামাজের জন্য তিনি একটি বিশাল হল নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যা কালক্রমে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। জনশ্রুতি আছে, মসজিদের পাথর চট্টগ্রাম থেকে আনা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে অলৌকিক ক্ষমতাবলে জলপথে ভাসিয়ে আনা হয়েছিল। বাস্তবে পাথরগুলো রাজমহল থেকেই আনা – এ নিয়ে ঐতিহাসিকরা একমত।নামকরণের নানা কাহিনিমসজিদটির নাম নিয়েও আছে নানা মত।ষাট গম্বুজ কেন? সংস্কৃত ‘সাত’ ও ফারসি ‘ছাদ’ মিলে ‘ছাদ গম্বুজ’ থেকে কথ্যরূপে ‘ষাট গম্বুজ’ হয়েছে বলে এক মত।আবার অন্য মতে, মসজিদের ভেতরে ছয়টি সারিতে দশটি করে মোট ৬০টি পাথরের স্তম্ভ (খাম্বা) আছে। স্তম্ভের ওপর ছাদ নির্মিত, তাই ‘ষাট খাম্বা’ থেকে ‘ষাট গম্বুজ’।গম্বুজের প্রকৃত সংখ্যা: নাম ‘ষাট গম্বুজ’ হলেও আসলে এখানে গম্বুজ ৬০টি নয়। মূল ভবনে ১১টি সারিতে ৭৭টি গম্বুজ, চার কোণার মিনারের ওপর চারটি গম্বুজ – মোট ৮১টি গম্বুজ। ৭৭টির মধ্যে ৭৪টিই অর্ধগোলাকার, শুধু মাঝের সারির সাতটি দেখতে বাংলার চৌচালা ঘরের চালের মতো।তাই অনেক গবেষক মনে করেন, মসজিদটির আসল নাম হওয়া উচিত ছিল ‘ষাট স্তম্ভ মসজিদ’ – কারণ এখানে প্রধান আকর্ষণ সেই ৬০টি পাথরের স্তম্ভ।স্থাপত্যের অনন্য বুননষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলীতে মিশেছে মধ্য এশিয়ার তুঘলক (তুরস্ক) ও জৌনপুরী ধারা, আবার রয়েছে স্থানীয় বাংলার ছোঁয়া।আকার ও পরিমাপবাইরের দিক: উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ ফুট, পূর্ব-পশ্চিমে ১০৪ ফুট।ভেতরের দিক: উত্তর-দক্ষিণে ১৪৩ ফুট, পূর্ব-পশ্চিমে ৮৮ ফুট।দেয়ালের পুরুত্ব: প্রায় ৮.৫ ফুট। ইটের তৈরি এসব দেয়াল অসাধারণ মজবুত।দরজা ও জানালাপূর্ব দেয়ালে ১১টি খিলানযুক্ত দরজা – মাঝেরটি সবচেয়ে বড়।উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি করে মোট ১৪টি দরজা।এই অসংখ্য দরজা আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য তৈরি, তবু ভেতরের দিকটা কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন – যা উপাসনার গাম্ভীর্য বাড়ায়।মিনার ও কোঠাচার কোণে চারটি গোলাকার মিনার। এদের চূড়ায় ছোট গম্বুজ। ছাদের কার্নিশের চেয়ে মিনারগুলো কিছুটা উঁচু। সামনের দিকের দুটি মিনারের ভেতর প্যাঁচানো সিঁড়ি – একসময় এখান থেকে আজান দেওয়া হতো।রওশন কোঠা: দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বুরুজ – আলো-বাতাসে ভরা।আন্ধার কোঠা: উত্তর-পূর্ব কোণের বুরুজ – তুলনামূলক অন্ধকার।ভেতরের স্তম্ভ ও গম্বুজের জঙ্গলভেতরে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ – উত্তর থেকে দক্ষিণে ছয় সারিতে, প্রতিসারিতে দশটি করে। প্রতিটি স্তম্ভ পাথর কেটে বানানো, তবে পাঁচটি স্তম্ভ পরে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই স্তম্ভের ওপর ভর করেই গম্বুজগুলো দাঁড়িয়ে। এক কথায়, এটি খিলান-স্তম্ভ-গম্বুজের এক বিস্ময়কর সমন্বয়।মিহরাব ও মিম্বারপশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব। মাঝের মিহরাবটি সবচেয়ে বড় ও কারুকার্যপূর্ণ। এর দক্ষিণে ৫টি, উত্তরে ৪টি মিহরাব। উত্তরে যেখানে একটি মিহরাব থাকার কথা, সেখানে রয়েছে একটি ছোট দরজা – অনেকে মনে করেন, এটি খানজাহান আলীর দরবার হলের প্রবেশপথ ছিল। ইমামের বসার জন্য রয়েছে পাথরের মিম্বার।রডবিহীন নির্মাণসবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো – এই মসজিদে কোনো লোহার রড ব্যবহার করা হয়নি। শুধু চুন, সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইট দিয়ে তৈরি এই কাঠামো প্রায় ৬০০ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও বর্তমান অবস্থা১৯৮৩ সালে (অনেক সূত্রে ১৯৮৫) ইউনেস্কো বাগেরহাট শহরটিকেই ‘ঐতিহাসিক মসজিদ শহর’ হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। আর এই মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু হলো ষাট গম্বুজ মসজিদ।বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ইউনেস্কোর যৌথ তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। এখনো এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হয়। একসঙ্গে মসজিদের ভেতরে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।ভ্রমণ তথ্য: কখন, কীভাবে, কত টাকা?প্রবেশ ফিদেশি পর্যটক: ৩০ টাকা (অনেক সূত্রে ২০ টাকাও উল্লেখ আছে – বর্তমানে ৩০ টাকাই বেশি প্রচলিত)মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী: ১০ টাকাসার্কভুক্ত দেশের নাগরিক: ২০০ টাকাঅন্যান্য বিদেশি: ৫০০ টাকাশিশু (০-১০ বছর) ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী: বিনামূল্যেঅনলাইন টিকেট: চাইলে myGOV ওয়েবসাইট থেকে কিউআর কোডযুক্ত টিকেট কেটে নিতে পারেন।খোলা ও বন্ধের সময়গ্রীষ্মকাল (গরমকাল): সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৬টাশীতকাল: সকাল ৯টা – বিকেল ৫টামধ্যাহ্ন বিরতি: দুপুর ১টা – ১টা ৩০ মিনিট (উভয় মৌসুমে)শুক্রবার বিশেষ বন্ধ: জুমার নামাজের জন্য দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট – বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটসাপ্তাহিক ছুটি: রোববার সারাদিন বন্ধ (সোমবার দুপুর ২টা থেকে খোলে)টিপস: নামাজের সময় (ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব, এশা) স্থানীয় মুসল্লিরা প্রবেশ করতে পারেন বিনামূল্যে। তবে পর্যটকদের নির্ধারিত সময় ও টিকিট মেনে চলতে হবে।মসজিদ চত্বরে জাদুঘরপ্রধান ফটকের ডান পাশে বাগেরহাট জাদুঘর। এখানে খানজাহান আমলের প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন – এমনকি খানজাহানের দিঘির ঐতিহ্যবাহী ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ কুমিরের মমি সংরক্ষিত আছে।জাদুঘরের সময়: গ্রীষ্মে সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৬টা, শীতে সকাল ৯টা – বিকেল ৫টা।মধ্যাহ্ন বিরতি: দুপুর ১টা – দেড়টা।ছুটি: রোববার সারাদিন।একই টিকিটে জাদুঘর ও মসজিদ কমপ্লেক্স ঘুরতে পারবেন।যাতায়াত: ঢাকা থেকে বাগেরহাটবাসেঢাকার সায়দাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে নিয়মিত বাস ছাড়ে। উল্লেখযোগ্য পরিবহন: মেঘনা, বনফুল, ফাল্গুনী, আরা, পর্যটক, বলেশ্বর, হামিম, দোলা, সোহাগ, শাকুরা, হানিফ, কমফোর্ট লাইন, ঈগল।ভাড়া: ৬৫০-৮০০ টাকা (প্রতি জন)।সময়: সকাল ৬টা-১০টা এবং সন্ধ্যা ৭টা-রাত ১০টা পর্যন্ত ছাড়ে।বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ড নেমে রিকশা বা সিএনজি নিলে ৩০-৪০ টাকায় পৌঁছে যাবেন ষাট গম্বুজ মসজিদে (সুন্দরঘোনা গ্রাম, খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের উত্তর পাশে)।ট্রেনেঢাকা থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস খুলগামী ট্রেনে খুলনা যান। সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে বাগেরহাট (সময় লাগে ১-১.৫ ঘণ্টা)।কোথায় থাকবেন?বাগেরহাটে তেমন বিলাসবহুল হোটেল নেই, তবে মাঝারি মানের থাকার জায়গা আছে।রেল রোডে মমতাজ হোটেল – সুযোগ-সুবিধা কম, কিন্তু সেবা ভালো। খরচ তুলনামূলক বেশি।খান জাহান আলীর মাজারের সামনে হোটেল অভি – মেইন হাইওয়েতে অবস্থিত।কেন্দ্রীয় বাসস্টেশন সংলগ্ন হোটেল আল আমিন এবং কর্মকার পট্টিতে হোটেল মোহনা।খুলনা খুব কাছে বলে চাইলে খুলনা গিয়েও রাত কাটাতে পারেন।খাওয়ার ব্যবস্থাবাসস্ট্যান্ড ও দরগার আশপাশে কয়েকটি মোটামুটি মানের হোটেল আছে। তবে দাম ও মান সম্পর্কে আগে জেনে নেওয়া ভালো। স্থানীয় মাছ ও ভাত খেতে পারেন – বাগেরহাটের ইলিশ বেশ有名।দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাতষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয় – এটি জীবন্ত একটি উপাসনালয়। প্রতি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় এখানে দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলাখ মুসল্লি জড়ো হন। এটি দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত। রমজান মাসে দুই হাফেজ খতম তারাবির নামাজ পড়ান এবং মুসল্লিদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা থাকে।আশপাশের দর্শনীয় স্থানমসজিদ ঘুরে সময় থাকলে আরও কয়েকটি স্থান দেখতে পারেন:বিবি বেগনির মসজিদ (৫০০ মিটার পেছনে) – ফুলের কারুকার্যময়।চুনাখোলা মসজিদ (বিবি বেগনির আরও ৫০০ মিটার পেছনে)।সিঙ্গাইর মসজিদ (মহাসড়কের পাশে)।নয় গম্বুজ মসজিদখান জাহান আলীর মাজারঘোড়া দিঘি ও রণবিজয়পুর দিঘিমোংলা বন্দর (চাইলে সুন্দরবন যাতায়াতের গেটওয়ে)।ভ্রমণে যা মেনে চলবেনহালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরুন – সুতির কাপড় উত্তম।পর্যাপ্ত পানি, বিস্কুট, মুড়ি, চিড়া ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন।মোবাইলের চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক নিতে ভুলবেন না।জ্বর, সর্দি, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ও স্যালাইন রাখুন।মসজিদে প্রবেশের আগে জুতা বাইরে রেখে পায়ে মোজা পরে প্রবেশ করুন।নামাজরত মুসল্লিদের বিরক্ত করবেন না। নির্ধারিত পর্যটক এলাকায় ঘুরুন।টিকিট কাটার পর জাদুঘর দেখতে ভুলবেন না – এটি একই ফিতে।শেষকথাষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু পাথর-চুন-সুরকির গাঁথনি নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুসলিম স্থাপত্যের এক জীবন্ত দলিল। এখানে দাঁড়ালে সময় থমকে দাঁড়ায়। শুনতে পাবেন খানজাহানের আজানের প্রতিধ্বনি, দেখতে পাবেন অর্ধগোলাকার গম্বুজের সারি মেঘ ছুঁতে চায়।আপনিও একবার চলে আসুন বাগেরহাটে। ষাট গম্বুজের ছায়ায় দাঁড়ান। ইতিহাসের স্পর্শ নিন। আর এই অসাধারণ স্থাপত্যের সাক্ষী হয়ে ফিরে আসুন – নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ