চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরা হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত প্রতিবেশী বাবু শেখকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) দুপুরে সীতাকুণ্ডের কুমিরা কাজীপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত জানান। দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাবু শেখ।
পারিবারিক শত্রুতার জেরে প্রতিশোধ
পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা মনির হোসেনের সঙ্গে অভিযুক্ত বাবু শেখের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এর জের ধরে প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে টার্গেট করা হয়। বাবু শেখের স্থায়ী বাড়ি গাইবান্ধা জেলায় হলেও সে শিশুটির বাড়ির পাশেই ভাড়া থাকত।
ঘটনার দিন গত রোববার (১ মার্চ) সকালে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বাবু শেখ শিশু ইরাকে চকলেট কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। কুমিরা থেকে বাসযোগে সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে নেমে পায়ে হেঁটে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
পুলিশ সুপার জানান, সেখানে গিয়ে শিশুটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায় বাবু শেখ। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে তার কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে। পরে শিশুটিকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় সে।
প্রাথমিক জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে অভিযুক্ত।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে আসামির ছবি
ঘটনার পর থেকেই অভিযানে নামে জেলা পুলিশ। সীতাকুণ্ডের কুমিরা থেকে পাহাড় পর্যন্ত সড়কের দীর্ঘ সিসিটিভি ফুটেজ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘাতককে শনাক্ত করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, ঘটনার দিন সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটের দিকে বাবু শেখ শিশু ইরার হাত ধরে ইকোপার্কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিও ফুটেজই মামলার তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় হিসেবে কাজ করে।
পুলিশ সুপার বলেন, 'ঘটনার পর ভুক্তভোগীর বাড়ি কুমিরা থেকে সীতাকুণ্ড পাহাড় পর্যন্ত সড়কের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় অভিযুক্ত বাবু শেখকে শনাক্ত করা হয়।'
ঘটনার দিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত
গত ১ মার্চ রোববার সীতাকুণ্ড পৌর সদরের ইকোপার্কের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। চন্দ্রনাথ মন্দির সড়কের সংস্কার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা তাকে প্রথমে দেখতে পান।
আহত শিশুটি নির্মাণাধীন সড়কের দিকে উঠে এলে শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে বেলা আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে থানায় খবর দেয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জান্নাতুল নাইমা ইরাকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওই রাতেই শিশুটির গলায় জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে পুনরায় নাক, কান ও গলা (ইএনটি) ওয়ার্ডে স্থানান্তরের পর মঙ্গলবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তার চাচা মো. রমিজ উদ্দীন জানান, চমেক হাসপাতালে শিশু ইরার গলায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। সোমবার শিশুটিকে ওসিসিতেও নেওয়া হয়।
মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া
ঘটনার দিন রাতেই শিশুটির মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম জানান, শিশুটির মৃত্যুর পর এই মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। গ্রেপ্তার আসামি বাবু শেখকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নির্যাতিত শিশুটির মৃত্যুতে বিভিন্ন মহলে নিন্দা ও শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন