নির্দলীয় স্থানীয় সরকারের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ) নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো। ইতিমধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। নির্দলীয় এই নির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে ইসি।
আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আইনি সংশোধনীর কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের প্রচারণায় পোস্টার থাকছে না—এমনটাই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ইসির নীতিনির্ধারকরা। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন ইসির সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, কমিশনের সামনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা। এ নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৪৯০টির মতো উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির মতো পৌরসভা ও ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এগুলো এখনই নির্বাচন করার উপযোগী। এসব নির্বাচন আয়োজনে আইনগত কোনো জটিলতা নেই। এছাড়া সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৬০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার যে ১৮০ দিন সময়সীমা রয়েছে, তা এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আরো ২ হাজার ৮০০-এর বেশি ইউনিয়ন পরিষদের সময়সীমা শুরু হবে।
জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিলের লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন আইনের ৩২(ক), পৌরসভা আইনের ২০(ক), উপজেলা পরিষদ আইনের ১৬(ক), এবং ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ১৯(ক) ধারা বাতিল করে সংসদে পৃথক আইন পাশ হয়। ঐ আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচনের পরিচালনা এবং আচরণ বিধিমালায় সংশোধনী আনার কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে এসব সংশোধনী আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে ইসি। তাদেরকে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে মানের হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই মানের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও চার নির্বাচন কমিশনার তাদের বক্তব্যে এসব নির্দেশনা দেন। এর মধ্য দিয়ে মূলত মাঠ প্রশাসনকে নির্বাচনের আগাম বার্তা দিল কমিশন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ না রাখার পক্ষে ইসি। ফলে পলাতক ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় মনোনয়নপত্রের ফরমে পরিবর্তন, প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করা এবং দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিল করতে যাচ্ছে ইসি।
আচরণ বিধিমালায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের নতুন বিধান যুক্ত করা হবে। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় ইসি।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, পরিচালনা বিধিমালায় সংশোধনী আসলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হবে। নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় এসব নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের প্রয়োজন হবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরসহ নামের তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা থাকবে না। ফলে আইন অনুযায়ী যোগ্য যে কেউ প্রার্থী হতে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সব প্রার্থী নির্দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন।
বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তাদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে সয়লাব হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অলিগলি ও জনসমাগমস্থল।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর দলীয় পূর্ণ শক্তি নিয়ে সবাই ভোটের মাঠে নামবে।’
জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনে তরুণ নির্ভর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে, এনসিপি প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা ও রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে এই প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন