১৬ বছর আগে ফরিদপুরে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা থেকে প্রায় কোটি টাকা লুট হয়। এ ঘটনায় চুরির অভিযোগে করা মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত বছর খালাস পান ব্যাংকটির তৎকালীন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। তবে এই মামলায় হাইকোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। একই ঘটনায় মানি স্যুটের (অর্থ উদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা) পরিপ্রেক্ষিতে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা প্রথম আপিল খারিজ করে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট।
ঘটনার বিবরণ ও মামলার ইতিহাস
নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জনতা ব্যাংকের ফরিদপুর করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা চুরি বা লুট হয়। তখন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশের বয়স ছিল ৫০ বছর। ঘটনার পরদিন ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। এই মামলায় পরেশকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে তিনি জামিন পান।
পরেশের জবানবন্দি
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দিয়েছিলেন পরেশ। তিনি জানান, রাতে তিনি ব্যাংকে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আসামিরা এসে তাঁর গলায় ছোরা ধরে তাঁকে চুপ থাকতে বলেন। আসামিদের মধ্যে তপু ও জাহিদ ছিলেন। তাঁরা তাঁকে চা–চটপটি খাওয়াতেন এবং ব্যাংকে একটি হিসাব খোলার কথা বলতেন। ঘটনার দিন তাঁরা তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা দেন।
ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালতের রায় ও আপিল
চুরির অভিযোগে করা মামলায় ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। পরেশ দায়রা আদালতে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাজা কমে দুই বছর হয়। এরপর হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করে পরেশ। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট পরেশকে দোষীসাব্যস্ত করা ও সাজা বাতিল ঘোষণা করে। তবে রায় ঘোষণার আগে ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি পরেশ মারা যান।
দেওয়ানি মামলায় ব্যাংকের আপিল খারিজ
চুরির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা উদ্ধারের জন্য ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট মানি স্যুট করে। ২০১৬ সালের ২৯ জুন আদালত তা খারিজ করে দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করে। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ৩ ফেব্রুয়ারি ওই আপিল খারিজ করেন। রায়ে ১০ হাজার টাকা খরচার সিদ্ধান্ত বহাল রেখে ক্ষতিপূরণ বাবদ আরও ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে পরেশের পরিবারকে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৬০ হাজার টাকা পাবে পরেশের পরিবার।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ৯৪ লাখের বেশি অর্থ লুটের অভিযোগ করা হয়। ব্যাংকের ভল্ট খোলার বিষয়ে কোনো অর্থপূর্ণ তদন্ত না করে কেবল পরেশসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। ভল্টটি কীভাবে খোলা হয়েছিল, তা নির্ণয়ে পুলিশ কার্যকর কোনো তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি দুর্ভাগ্যজনক যে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট হওয়া সত্ত্বেও প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অন্যান্য ব্যক্তির ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত না করে শুধু পরেশকে জড়িত করেছে। বিশেষ করে ভল্টের চাবি যাঁদের হেফাজতে ছিল এবং পিকনিক থেকে ফিরে ঘটনার দিন ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে যাঁরা আবার ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন, তাঁদের বিষয়ে। এ ধরনের আচরণ আদালতের কার্যপ্রণালির অপব্যবহারের শামিল।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া
পরেশের ছেলে প্রণব কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে বাবাসহ আমাদের পরিবারকে অনেক ভোগান্তি ও হয়রানি পোহাতে হয়েছে। সামাজিকভাবেও হেয় হতে হয়েছে। আইনি লড়াই চলার মধ্যেই বাবা মারা যান। প্রকৃত অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তবে তিনি রায়টা দেখে যেতে পারেননি, যা আমাদের কষ্ট দেয়।’ তিনি আরও জানান, বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর চাকরি–পরবর্তী প্রাপ্য সুবিধা পরিবারকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে, এটাই প্রত্যাশা।
ফরিদপুরের ব্যাংক লুটের ঘটনায় ১৬ বছরের আইনি লড়াই শেষে নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস মৃত্যুর পর খালাস পেলেন। হাইকোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণে প্রকৃত অপরাধীদের তদন্তে ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা দেওয়ানি আপিল খারিজ হয়েছে এবং পরিবারকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা পড়েনি। পরেশের পরিবার এখন চাকরি পরবর্তী প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার আশায় রয়েছে।

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন