সম্প্রতি ফ্রান্সের আদালত কাঁপানো একটি মামলার রায় এবং ভুক্তভোগী নারীর লোমহর্ষক জবানবন্দি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ‘মনে হচ্ছিল আমি ভেতর থেকে মরে যাচ্ছি’— ফরাসি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক সাবেক ব্যাংক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে এভাবেই নিজের ওপর চলা সাত বছরের নারকীয় নির্যাতনের বর্ণনা দেন ৪২ বছর বয়সী ল্যাটিটিয়া আর। তাঁর সাবেক প্রেমিক গুইলোম বুচ্চি তাঁকে শুধু শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনই করেননি, বরং ব্ল্যাকমেইল করে বছরের পর বছর ধরে ঠেলে দিয়েছেন চার শতাধিক বেশি অচেনা পুরুষের শয্যায়।
ল্যাটিটিয়া আদালতে জানান, ‘৪৮৭ জন পুরুষের পর আমি এমন পুরুষের সংখ্যা আর গোনা বন্ধ করে দিই।’ এদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে তাকে ১০ বার পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বছরের পর বছর চলা এই নির্মম নির্যাতনের ফলে বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার।
২০১৫ সালের ক্রিসমাস ইভ বা বড়দিনের আগের রাতে বুচ্চি ল্যাটিটিয়াকে এক মহাসড়কের সার্ভিস স্টেশনে অচেনা পুরুষদের কাছে ‘নিজেকে সঁপে দিতে’ বাধ্য করে, আর নিজে ফোনে ওপাশ থেকে সেই শব্দ শুনছিল।
২০১৭ সালে কন্যাসন্তান জন্ম দেয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র একদিন পরই তাকে এক ট্রাকচালকের সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ল্যাটিটিয়া আদালতে বলেন, ‘আমার মনে হতো আমি ভেতর থেকে মারা যাচ্ছি। প্রতিটি জোরপূর্বক কাজের সঙ্গে আমার একটি অংশ চিরতরে ভেঙে গেছে।’
বিচারের মুখোমুখি হয়ে অভিযুক্ত বুচ্চি শ্বাসরোধ করা, পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা পশুর সাথে বিকৃত যৌনাচারের মতো পৈশাচিক সব কাণ্ড ঘটানোর কথা স্বীকার করেছেন। তবে নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে দাবি করেন, এগুলো ছিল তাদের গভীর সম্পর্কের রসায়নে তৈরি পারস্পরিক সম্মতির যৌন খেলা! সে নাকি বুঝতেও পারেনি যে, এর মাধ্যমে সে ল্যাটিটিয়াকে আঘাত করছিল।
মামলার সরকারি আইনজীবীরা বুচ্চির এই অপরাধকে চরম বিপজ্জনক এবং অন্য নারীদের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে আদালত সব তথ্যপ্রমাণ ও জবানবন্দি বিবেচনা করে গুইলোম বুচ্চিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, এই মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ জেল খাটার আগে সে কোনোভাবেই প্যারোলে মুক্তির আবেদন করতে পারবে না।
ল্যাটিটিয়া জানান, ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘জিজেল পেলিকট’ মামলাটি (যেখানে এক স্বামী নিজের স্ত্রীকে ড্রাগ খাইয়ে অজ্ঞান করে শত শত অচেনা পুরুষ এনে ধর্ষণ করিয়েছিল) দেখার পরই তিনি নিজের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান। বুচ্চির বন্ধ কক্ষে বিচার চাওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ল্যাটিটিয়া প্রকাশ্য বিচার বেছে নেন।
পৈশাচিকতা ও মানসিক দাসত্বের এই রোমহর্ষক ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, ভালোবাসার আড়ালে কত বড় দানব লুকিয়ে থাকতে পারে। ল্যাটিটিয়ার সাহস ও প্রকাশ্য বিচার অন্যান্য নির্যাতিত নারীদের জন্য পথ দেখাবে। বুচ্চির ‘সম্মতি’ দাবি প্রমাণের মুখে ভেস্তে গেছে। এই রায় প্রমাণ করল, ভয় ও জবরদস্তির সম্পর্ক কখনো ‘সম্মতি’ হতে পারে না।

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন